বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সেদিন কী ঘটেছিল?

করুণাশ্রী মহাথের: ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ছিল বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধুপূর্ণিমা। পরের দিন ৩০ সেপ্টেম্বর শুরু হতো মধুদান কর্মসূচি। আনন্দ নিয়ে রাত্রী যাপন করছিলাম। রাত প্রায় দুইটার দিকে কয়েক শ লোক লাঠিসোঁটা, দা, কিরিচ নিয়ে বিহারে হামলা চালায়। আমরা ভাবতেও পারিনি এ রকম একটা ঘটনা ঘটবে। স্বাধীন দেশে প্রাণভয়ে বৌদ্ধবিহার ফেলে পালিয়ে আমাদের জঙ্গলে আশ্রয় নিতে হবে ভাবতেও পারিনি। সেই রাতে দুর্বৃত্তরা ১০০ ফিট লম্বা সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধমূর্তিতে আঘাত হানতে লাগল, হেমার-খুন্তি দিয়ে বড় বড় আঘাত করছিল এবং মূর্তির ভেতরে ঢুকে একে একে চারটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাল। পাশের ভাবনাকেন্দ্র বৌদ্ধবিহারে দেওয়া হলো আগুন। আগুনে বিহারটি পুড়ে গেল। কিন্তু এত আঘাতের পরও বুদ্ধমূর্তির তেমন ক্ষতি হয়নি, কয়েকটি অংশে ফাটল ছাড়া। হামলার অবস্থা দেখে মনে মনে ভেবেছিলাম, এই বুদ্ধমূর্তি আর নেই, মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। কিন্তু অদৃশ্য শক্তি সেদিন সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধমূর্তিটিকে রক্ষা করেছিলেন। ২৯ সেপ্টেম্বর এলেই ২০১২ সালের হামলার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়, চোখে জল আসে। বুক ভারী হয়ে যায়।

পাহাড়চূড়ায় বিশাল বুদ্ধমূর্তি তৈরির কারণ কী ছিল?

করুণাশ্রী মহাথের: আমার স্বপ্ন বা ইচ্ছা ছিল পাহাড়চূড়ায় দৃষ্টিনন্দন একটা গৌতম বুদ্ধমূর্তি বানাব, যেটা বাংলাদেশে নেই, এশিয়ার মধ্যে হয়তো থাকবে না। বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে প্রতিবছর দেশি–বিদেশি লাখ লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটে। প্রথমত, তাঁদের মধ্যে বৌদ্ধধর্মীয় ঐহিত্য-সংস্কৃতি তুলে ধরা, ধর্মকর্ম পালন এবং পর্যটনকে আরেক ধাপ এগিয়ে নেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

২০০৬ সালে ৫০ ফুট উঁচু পাহাড়চূড়ার উন্মুক্ত জায়গায় শুরু হয় ১০০ ফিট লম্বা সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধমূর্তির নির্মাণকাজ। মূর্তির মাথা দক্ষিণ দিকে, পা উত্তর দিকে। উচ্চতা ৪০ ফিট, প্রস্থ ২২ ফিট। ব্যক্তিগত টাকা দিয়ে কাজ শুরু। এরপর ভক্তদের অনুদান, বিদেশ থেকে পাঠনো টাকায় ২০১২ সালের আগস্ট মাসে কাজ শেষ হয়। বাকি ছিল মূর্তির শরীরে রং লাগানো। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে বিশাল এই মূর্তির উদ্বোধনের কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই হামলার ঘটনা ঘটল। হামলার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদসহ দেশি–বিদেশি রাষ্ট্রীয় ও বিশিষ্টজনেরা বুদ্ধমূর্তিটি দেখে গেছেন। এই মূর্তি কক্সবাজারবাসীর সম্পদ। এই ডিজাইনের এত বড় বুদ্ধমূর্তি এশিয়ার কোথাও আছে বলে জানা নেই, দেখা যাচ্ছে না।

সিংহশয্যা মানে কী?

করুণাশ্রী মহাথের: পশুর রাজা সিংহ ডান পাশ হয়ে ঘুমায়, সতর্ক অবস্থায় থাকে। গৌতম বুদ্ধও বুদ্ধত্ব লাভের আগপর্যন্ত ৪৫ বছর ডান পাশ হয়ে ধ্যানযুগে থাকতেন। ডান হাতের ওপর মাথা রেখে, বাঁ হাত গায়ের ওপরে রাখতেন। পায়ের ওপর পা রেখে সারা রাত, যতক্ষণ ঘুম আসেনি, ততক্ষণ ধ্যানে থাকতেন। সিংহের ঘুমানোর যে পদ্ধতি, সে পদ্ধতিতে বুদ্ধ ঘুমাতেন বলে মূর্তির নামকরণ সিংহশয্যা মূর্তি।

default-image

হামলাকারীরা এখন কোথায়?

করুণাশ্রী মহাথের: তারা তো বেশি দূরের নয়। গভীর রাতে যখন হামলা চলছিল, তখন আমরা কারও চেহারা দেখিনি, প্রাণভয়ে পালিয়েছিলাম। পরবর্তী সময়ে আমরা বিভিন্নভাবে জেনেছি, হামলাকারীরা দূরের–কাছের চেনাজানা লোক। তবে এখন হুমকি–ধমকি নেই। আমরাও চেষ্টা করেছি, করে যাচ্ছি—পুনরায় যেন হামলা না হয়। যদিও হামলাটা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। সেদিন যারা হামলা করেছিল, তারাও বুঝে গেছে—কাজটা ভালো করেনি তারা।

হামলার বিচার চান, কিন্তু আদালতে সাক্ষ্য দিচ্ছেন না কেন?

করুণাশ্রী মহাথের: বিচার অবশ্যই আমরা চাই। ঘটনার শুরুতে পুলিশের পক্ষ থেকে আমাদের বলা হয়েছিল, বাদী হয়ে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে। আমরা ভেবেছি, হামলাকারীরা যেহেতু বিহারের আশপাশের লোকজন, বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করলে সমস্যা দেখা দিতে পারে, নিরাপত্তার বিঘ্নিত হতে পারে। সম্প্রীতি নষ্ট হয়েছে, এখন মামলার বাদী কিংবা সাক্ষী হলে তখন আরও নষ্ট হবে, বিপদ বেড়ে যাবে। মূলত সম্প্রীতি রক্ষার জন্যই আমরা তখন থেকেই বলে আসছিলাম— মামলার বাদী-সাক্ষী কোনোটাই হব না আমরা। সে জন্য পুলিশ বাদী হয়ে ১৪ হাজার মানুষের বিরুদ্ধে ১৮টা মামলা করেছিল। এরপরও পুলিশ সাক্ষী হিসাবে আমাদের নাম দিয়েছে। সাক্ষী করার কথা কেউ জানে, কেউ জানেও না। কিন্তু কোনো সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিতে যাবেন বলে মনে হয় না। কারণ, সেদিন যারা বিহারে হামলা করেছিল, বুদ্ধমূর্তিতে আগুন দিয়েছিল, ভাঙচুর করেছিল, মিছিল মিটিয়ে নেতেত্ব দিয়েছিল—তাদের ছবি তখন ফেসবুক, গণমাধ্যমে প্রচার পেয়েছিল। এগুলো ধরে তদন্ত করলেই রামু হামলার বিচার হয়ে যায়। আমরা সম্প্রতি নিয়ে বসবাস করতে চাই। ঝামেলায় যেতে চাই না।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

করুণাশ্রী মহাথের: আপনাকেও ধন্যবাদ।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন