ছররা গুলিতে বাঁ চোখ হারাতে বসেছে শিশু তোফাজ্জল

পাঁজর, পেট ও বাঁ চোখে স্প্লিন্টারবিদ্ধ হয়েছে শিশু তোফাজ্জল হোসেন।
ছবি: প্রথম আলো

শরীর ও বাঁ চোখ ছররা গুলির স্প্লিন্টারে বিদ্ধ হয়েছে। এর পর থেকে বাঁ চোখে দেখতে পাচ্ছে না শিশু তোফাজ্জল হোসেন (৯)। অর্থের অভাবে চিকিৎসাও করাতে পারছে না পরিবার। এখন তার চোখের আলো নিভতে বসেছে।

তোফাজ্জল হোসেন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মগটুলা ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামের মৃত ফজলুল হকের ছেলে। সে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র।

৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সপ্তম ধাপের ইউপি নির্বাচনে ভোট গ্রহণের পর উপজেলার নাউরিপাড়া ইকরিয়াকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে দুই ইউপি সদস্য প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের নিবৃত্ত করতে ছররা গুলি ছোড়ে পুলিশ। এতে স্প্লিন্টারে বিদ্ধ হয় তোফাজ্জল।

১৮ ফেব্রুয়ারি শ্রীরামপুর গ্রামে তোফাজ্জল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে তাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় তার মা জোসনা বেগম বলেন, ‘ডাক্তার ছেলেকে ঢাকায় নিয়ে যেতে বলেছে। কিন্তু আমাদের টাকাপয়সা নেই। তাই ছেলের চিকিৎসা করাতে পারছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলে তো কোনো অপরাধ করেনি। পুলিশ কেন তাকে গুলি করে এ অবস্থা করল? ছেলেটা সারা দিন নির্জীব হয়ে বিছানায় পড়ে থাকে। ওর এখন কী হবে?’

হাসপাতালের ব্যবস্থাপত্রে দেখা যায়, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভর্তি ছিল তোফাজ্জল। তার পাঁজর, পেট ও বাঁ চোখে স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়েছে। তাকে ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে নিতে বলেছেন চিকিৎসকেরা।

আজ দুপুরে জোসনা বেগম মুঠোফোনে বলেন, স্বজনদের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার করে গত শনিবার ছেলেকে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসক দেখিয়েছেন। চিকিৎসক ওষুধ দিয়েছেন। বলেছেন, এক সপ্তাহ পর আবার ঢাকায় নিতে। গতকাল রোববার রাতে তোফাজ্জলকে বাড়ি নিয়ে এসেছেন। আবার ঢাকায় নিয়ে যেতে টাকার প্রয়োজন। তখন কোথায় টাকা পাবেন, এ নিয়ে চিন্তিত তিনি।

গ্রামবাসী ও ওই নির্বাচনে অংশ নেওয়া কয়েকজন প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় নাউরিপাড়া ইকরিয়াকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ভোট গণনার পর এজেন্টদের কাছে ফলাফলের কাগজ দিয়ে যাচ্ছিলেন নির্বাচনী কর্মকর্তারা। এ সময় দুই ইউপি সদস্য প্রার্থীর সমর্থকেরা প্রকাশ্যে ফলাফল ঘোষণার দাবি জানিয়ে তাদের পথ আগলে দাঁড়ান। তখন পুলিশ শটগানের গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ ঘটনায় শিশু তোফাজ্জল হোসেন ও মেহেদী হাসানসহ প্রায় ২০ জন আহত হয়। গুরুতর আহত আটজনকে প্রথমে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে তোফাজ্জল ও মেহেদীর অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল। এই দুজনকে তাৎক্ষণিক কয়েক ব্যাগ রক্ত দিতে হয়।

সেদিন কী হয়েছিল জানতে চাইলে তোফাজ্জলের ভাবি তাসলিমা আক্তার বলেন, তোফাজ্জল রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে ছিল। পরে তাকে তিনি কোলে করে বাড়ির কাছে নিয়ে আসেন।

জসীম উদ্দিন (৭০) নামে গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, গ্রামবাসী কেবল গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদের হাতে তো লাঠিসোঁটা ছিল না। তাহলে গুলি চালানো হলো কেন? শরীরে স্প্লিন্টার নিয়ে গ্রামের দুই শিশুর একজন অন্ধ ও অপরজন পঙ্গু হতে চলেছে। এ জন্য কারা দায়ী। কেউ তো খোঁজ নিতেও আসেনি।

মেহেদী হাসানের তলপেট স্প্লিন্টারে বিদ্ধ হয়েছে।
ছবি: প্রথম আলো

অপর আহত শিশু মেহেদী হাসান (১৪) পাশের নাউরিপাড়া ইকরিয়াকান্দা গ্রামের মো. বাবুল মিয়ার ছেলে ও স্থানীয় একটি স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। তার পেটে স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়েছে। মেহেদী হাসানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মেহেদীকে উঠানে বসিয়ে গোসল করাচ্ছে তার মা। বাড়ির লোকজন বলেন, আগে পুকুরে সাঁতার কাটত, ছোটাছুটি করত মেহেদী। এখন সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে। এ সময় মেহেদী হাসান বলে, হাঁটতে গেলে পেটে অসহ্য যন্ত্রণা হয়।

আরও পড়ুন

সেদিন কী হয়েছিল প্রশ্ন করলে মেহেদী হাসান বলে, মেম্বার কে হয়েছেন তা জানার কৌতূহল ছিল তার। এ কারণে ওই দিন সন্ধ্যায় ভোটকেন্দ্রের কিছুটা দূরে একটি কলাবাগানের ভেতর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। কিছুক্ষণ পর হইচই শুরু হলে একটি শব্দ হয়। হঠাৎ শরীরে প্রচণ্ড যন্ত্রণা অনুভব করে সে। তাকিয়ে দেখে, শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। একপর্যায়ে মাটিতে পড়ে যায়। এরপর পরিচিতি এক ব্যক্তিকে দেখে ডাক দেয়। ওই ব্যক্তি তাকে কোলে করে বাড়িতে নিয়ে আসে। পরে তাকে হাসপাতলে নেওয়া হয়।

৭ ফেব্রুয়ারি ভোটকেন্দ্রের সামনে ওই গুলি ছোড়ার ঘটনা সম্পর্কে জানতে দায়িত্ব পালনকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও ঈশ্বরগঞ্জ মহিলা কলেজের প্রভাষক মো. সিরাজুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল কাদের মিয়া বলেন, ওই দিন উপজেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা দূর করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা শটগানের গুলি ছুড়ে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন। এসব ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে।