ওবায়দুর রহমান বাবু
ওবায়দুর রহমান বাবুফেসবুক থেকে সংগৃহীত

সাতক্ষীরায় তালায় ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে এক ঘণ্টা পরই আত্মহত্যা করেছেন ছাত্রলীগ নেতা। ওবায়দুর রহমান বাবু (২৫) নামের ওই তরুণ খুলনা বিএল কলেজে ইতিহাসের মাস্টার্সের ছাত্র ছিলেন। তিনি বিএল কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছাড়াও তালা উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। সম্প্রতি খলিলনগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী ছিলেন তিনি।

গতকাল শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে ফেসবুকে সর্বশেষ স্ট্যাটাসটি দেন ওবায়দুর। এরপর বিকেল পাঁচটা থেকে সোয়া পাঁচটার মধ্যে এই ছাত্রলীগ নেতা মারা যান। তিনি তালার খলিলনগর ইউনিয়নের হরিসচন্দ্রকাটি গ্রামের শেখ মঞ্জুরুল রহমানের ছেলে। দুই বছর আগে তাঁর মা মারা যান। বিষপানে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ময়নাতদন্ত সূত্রে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ ও পরিবার।

ওবায়দুর ফেসবুকে ‘ত্যাড়া মুন্সী বাবু’ ও ‘শেখ রিয়াদ’ নামে দুটি অ্যাকাউন্ট চালাতেন বলে জানিয়েছেন তাঁর ছোট ভাই জাহিদুর ইসলাম। দুটিতেই তিনি আত্মহত্যার ঘণ্টাখানেক আগে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। ওই স্ট্যাটাসসহ গত ২৪ ঘণ্টায় আরও বেশ কটি স্ট্যাটাসে তিনি শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্দেশে আত্মহত্যার কারণ বলে গেছেন। ওবায়দুরের এই স্ট্যাটাসগুলোসহ বন্ধুদের সঙ্গে তাঁর কিছু চ্যাটের স্ক্রিনশট এখন ফেসবুকে ভাইরাল।

মাসখানেক আগে ভাই ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য রাতে বাবার কাছে এক লাখ টাকা চায়। পরে আবারও টাকা চান ভাই। বাবা টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ভাই বাড়ি থেকে সপ্তাহখানেক আগে চলে চায়। বৃহস্পতিবার বাড়ি এসে শুক্রবার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যা করে।
জাহিদুর ইসলাম, ওবায়দুরের ছোট ভাই
বিজ্ঞাপন
default-image

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খলিলনগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সর্বশেষ কমিটি হয়েছে ১৭ মাস আগে। ওই কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি করা হবে বলে উপজেলার কমিটির নেতারা পদপ্রত্যাশীদের আশ্বাস দিয়ে আসছিলেন। ওবায়দুর ইউনিয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হওয়ায় পদ পেতে তাঁর কাছে উপজেলা ছাত্রলীগ কমিটির সভাপতি শেখ সাদী এক লাখ টাকা উৎকোচ দাবি করেন। এর আগেও আশ্বাস দিয়ে তাঁকে নেতা বানানো হয়নি। এই টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ওবায়দুর নানা জায়গায় ধরনা দিয়েও ব্যর্থ হন। অবশেষে বাবার কাছে টাকা চাইলে তাঁর বাবা অপারগতা প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে ওবায়দুর ক্ষোভে ও দুঃখে আত্মহত্যা করেন। পদ না পাওয়ার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কিছু অপ্রাপ্তির দুঃখও তাঁকে আত্মহননে প্ররোচিত করেছে বলে ফেসবুকে ওবায়দুরের স্বীকারোক্তি ও তাঁর পরিচিতদের সূত্রে জানা গেছে।

ওবায়দুরের ছোট ভাই জাহিদুর ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাসখানেক আগে হবে, ভাই ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য রাতে বাবার কাছে এক লাখ টাকা চায়। বাবা বলেন, তোকে তিন লাখ টাকা দিতেও রাজি, আগে পদ নিশ্চিত কর, তারপর। বাবা তাকে ১০ হাজার টাকা দেন। এসব নিয়ে ভাই হতাশায় ভুগছিল। পরে আবারও টাকা চান ভাই। বাবা টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ভাই বাড়ি থেকে সপ্তাহখানেক আগে চলে চায়। বৃহস্পতিবার বাড়ি এসে শুক্রবার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যা করে।’ জাহিদুরের দাবি, ছাত্রলীগের নেতারা তাঁর ভাইকে টাকার বিনিময়ে পদ দিতে চেয়ে তাঁর ভাইকে অকালমৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছেন।

আমি ছাত্রলীগ করব বলে ঘরে সৎমা আনছি। আমি ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সেক্রেটারি প্রার্থী। তখন শেখ সাদী (উপজেলা কমিটির সভাপতি) আমায় বলে, এক লাখ টাকা লাগবে, না হলে কমিটি পাবা না।
ফেসবুক চ্যাটে ওবায়দুর
default-image

তালা উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান সরদার মশিয়ার রহমান বলেন, ‘ওবায়দুর রহমান বাবু ছাত্রলীগের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি খলিলনগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী ছিলেন। বাবুর বাবা শেখ মঞ্জুরুল রহমানের কাছ থেকে শুনেছি, ওই পদের জন্য এক লাখ টাকা চেয়েছে। পদের জন্য নেতাদের চাহিদামতো টাকা দিতে না পেরে বাবু হতাশায় ছিলেন। দুই বছর আগে তাঁর মা মারা যাওয়া এবং প্রেমঘটিত বিষয় নিয়ে তাঁর হতাশার আগুনে এই ঘটনা ঘি ঢালে। শেষে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন তিনি।’

প্রায় একই ধরনের কথা বলেছেন খলিলনগর সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা প্রণব ঘোষও। এদিকে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী আক্তার হোসেন তাঁর ফেসবুক আইডিতে বাবুর ছবিসহ স্ট্যাটাস দিয়েছেন, ‘টাকা দিয়ে কমিটি কিনতে না পারায় তালা উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা শেখ ওবায়দুর রহমানের আত্মহত্যা মেনে নেওয়া যায় না। টাকার বিনিময়ে রাজনীতি বন্ধ হোক। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

আক্তার হোসেন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, দুঃখজনকভাবে একজন ছাত্রলীগের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ঝরে গেলেন। এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

টাকা দিয়ে কমিটি কিনতে না পারায় তালা উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা শেখ ওবায়দুর রহমানের আত্মহত্যা মেনে নেওয়া যায় না। টাকার বিনিময়ে রাজনীতি বন্ধ হোক। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
কাজী আক্তার হোসেন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রলীগ
বিজ্ঞাপন
default-image

ওবায়দুর এক ফেসবুক চ্যাটে লিখেছেন, ‘আমি ছাত্রলীগ করব বলে ঘরে সৎমা আনছি। আমি ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সেক্রেটারি প্রার্থী। তখন শেখ সাদী (উপজেলা কমিটির সভাপতি) আমায় বলে, এক লাখ টাকা লাগবে, না হলে কমিটি পাবা না। তুমি অ্যাকটিভ কর্মী, তাই তোমার কাছ থেকে কম টাকা নিচ্ছি। কমিটি পেলাম না যেদিন কমিটি ঘোষণা হয়।’ আগেও ওবায়দুর আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। ওবায়দুর লিখেছেন, ‘যাকে ভালোবাসতাম, তার বিয়ে হয়ে গেল। ছাত্রলীগ করব বলে তাকে নিয়ে পালাতে পারলাম না।’ তিনি কমিটি পাননি কষ্ট নেই, কিন্তু টাকার বিনিময়ে বিএনপি পরিবারের ছেলেদের কমিটিতে নেতা বানানো হয়েছে, এটিই তাঁর কষ্ট বলে স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেছেন ওবায়দুর।

ওবায়দুর তাঁর স্ট্যাটাসের এক জায়গায় লিখেছেন, ‘ছোটবেলা থেকে আমার রক্তে মিশে আছে রাজনীতি। আমি বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাঁর দেখানো পথেই চলে আসছি আজ অবধি। চাকরি বা বিয়ে—কোনোটাই করিনি ছাত্রলীগ করব বলে। কিন্তু আজ দলও টাকার কাছে জিম্মি।...আমার জীবনে আজ অবধি যত খারাপ সময়, তার সবকিছু এই রাজনীতির জন্য। ভবিষ্যতের কথা ভাবিনি কখনো। আজ জীবনের এই শেষ সময় কেন জানি মনে হচ্ছে, এই ছাত্রলীগের নেশাটাই আমাকে শেষ করে দিল। হারিয়েছি সব—ঘর, পরিবার, ভালোবাসার মানুষ, কাছের মানুষ—সবকিছু হারিয়েছি এই রাজনীতির জন্য।’

উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এই দুই সদস্যবিশিষ্ট। সাতক্ষীরা জেলা কমিটি বিলুপ্ত হওয়ায় পরিপূর্ণ উপজেলা কমিটি করা যায়নি। ফলে ইউনিয়ন পর্যায়ে সম্প্রতি কোনো কমিটিও দেওয়া হয়নি। এ কারণে টাকা লেনদেনের কোনো প্রশ্নই আসে না।
শেখ সাদী, সভাপতি, তালা উপজেলা ছাত্রলীগ

ওবায়দুরের শেষ স্ট্যাটাসে পদ পেতে টাকা চাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় তালা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শেখ সাদীর সঙ্গে। সাদী প্রথম আলোকে বলেন, উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এই দুই সদস্যবিশিষ্ট। সাতক্ষীরা জেলা কমিটি বিলুপ্ত হওয়ায় পরিপূর্ণ উপজেলা কমিটি করা যায়নি। ফলে ইউনিয়ন পর্যায়ে সম্প্রতি কোনো কমিটিও দেওয়া হয়নি। এ কারণে টাকা লেনদেনের কোনো প্রশ্নই আসে না। তাঁরা কমিটিতে আসার পর ওবায়দুর রহমান বাবুকে ছাত্রলীগে সক্রিয় দেখা যায়নি। তবে তিনি কেন এ ধরনের স্ট্যাটাস দিয়েছেন, তা বুঝতে পারছেন না বলে জানান সাদী।

তালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী রাসেল বলেন, ওবায়দুরের মরদেহ আজ শনিবার সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। ওসি জানান, নিহত ওবায়দুর নানা কারণে হতাশায় ভুগছিলেন বলেন তিনি শুনেছেন।

মন্তব্য পড়ুন 0