default-image

বাঁ হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে ইজিবাইকচালক আনোয়ার হোসেন গত ৪ নভেম্বর ঢাকার সাভার নামাবাজার এলাকায় ফোর্ডনগর সেতুর ঢালে দাঁড়িয়ে যাত্রী ডাকছিলেন। সাভার-খরারচর-সোয়াপুর-শ্রীরামপুর সড়কে গাড়ি চালান তিনি। কয়েক মিনিটের মধ্যে যাত্রী নিয়ে ভাঙা হাতে গাড়ি চালিয়ে খরারচর বাজারের উদ্দেশে ছোটেন তিনি।
জানতে চাইলে হাতে আঘাত পাওয়ার বিষয়ে আনোয়র বলেন, মাস দু-এক আগে খরারচর বাজার থেকে যাত্রী নিয়ে সাভার যাচ্ছিলেন। পথে ফরিঙ্গা মধ্যপাড়ায় সড়কের ভাঙায় যাত্রীসহ তাঁর তিন চাকার যানটি উল্টে যায়। এতে দুই যাত্রীসহ তিনি আঘাত পান।
পুরোপুরি সুস্থ না হয়ে ইজিবাইক নিয়ে বের হয়েছেন কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার বলেন, তাঁর পাঁচ সদস্যের পরিবার চলে ইজিবাইকের আয়ে। গাড়ির চাকা ঘুরলে বাড়িতে চুলা জ্বলে আর চাকা না ঘুরলে চুলা জ্বলে না। বাড়িতে বিশ্রামে থাকা অবস্থায় ধারদেনা করেছেন। তাই কিছুটা সুস্থ হয়ে পেটের তাগিদে গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন।
শুধু আনোয়ার নন, তাঁর মতো আরও অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাভার-খরারচর-সোয়াপুর-শ্রীরামপুর সড়কে ইজিবাইক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাচ্ছেন, যাঁদের অনেকই মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ধামরাইয়ের শ্রীরামপুর থেকে সোয়াপুর ও খরারচর বাজার হয়ে সাভার পর্যন্ত প্রায় ২২ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ১৭ কিলোমিটার চলাচল অনুপযোগী। শ্রীরামপুর থেকে সোয়াপুর বাজার পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার আর খরাররচর বাজার থেকে সাভার পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা নাজুক। খরারচর বাজার থেকে সাভার পর্যন্ত অংশের পুরোটাই খোয়া ও পিচ উঠে গেছে। এর ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচল করায় ছোট-বড় হাজারো গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলে এসব গর্তে জমে থাকা পানি দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ধামরাই উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সোয়াপুর বাজার থেকে সাভার বাজার পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার সড়কের সংস্কারে গত বছর দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্রে অংশ নিয়ে ১৭ কোটি ৭১ লাখ ৩৫ হাজার ৭৬৮ টাকায় কাজ পায় ফরিদপুরের ইমতিয়াজ হাসান ওরফে রুবেলের প্রতিষ্ঠান রাফিয়া কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী গত ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রকল্পের মাত্র ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজের জন্য বারবার তাগাদা দিয়েও ঠিকাদারের সাড়া না পেয়ে গত ১০ অক্টোবর ঢাকার নির্বাহী প্রকৌশলী কার্যাদেশ বাতিল করে দেন।
গত ৩ নভেম্বর প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সোয়াপুর থেকে খরারচর বাজার পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার সড়কের পাকাকরণের কাজ শেষ হয়েছে। তবে পাকা অংশের দুই পাশে চার ফুট করে মাটির কাজ করার কথা থাকলেও অনেক জায়গায় তা পাওয়া যায়নি। খরারচর বাজার থেকে সাভার বাজার পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার অংশে কোনো কাজ হয়নি।

ফরিঙ্গা মধ্যপাড়ায় ভাঙা সড়কের পাশের কাজল স্টোরের মালিক জাকির হোসেন বলেন, বানের পানির তোড়ে তাঁর দোকানের পাশে সড়কের প্রায় ৫০ ফুট এলাকা ভেঙে যায়। পরে ইজিবাইক ও অটোরিকশার চালকেরা নিজেদের টাকায় ইট ফেলে ভাঙা অংশ ভরে দেন। এরপর থেকে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। প্রায় প্রতিদিনই সড়কের ওই ভাঙা অংশে ইজিবাইক উল্টে যায়।
অটোরিকশাচালক সেলিম মোল্লাহ বলেন, ভাঙা সড়কে গাড়ি চালাতে গিয়ে একদিকে যেমন খরচ বেড়ে গেছে, অন্যদিকে আয় কমে গেছে। ভাঙা সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রায় প্রতিদিনই গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে দুর্ঘটনার ভয়ে যাত্রীরা বিকল্প পথে চলাচল করায় আগের মতো আয় হয় না।
স্থানীয় রোয়াইল ইউনিয়নের (ইউপি) ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নেপাল চন্দ্র সাহা বলেন, কয়েক বছর আগে শ্রীরামপুর-সোয়াপুর-সাভার সড়কের খরারচর থেকে সাভার বাজার পর্যন্ত চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
রোয়াইলের ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম সামসুদ্দিন বলেন, দক্ষিণ ধামরাইয়ের রোয়াইল ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে সারা বছর সবজির আবাদ হয়। এখানকার সবজি রাজধানীর বড় একটা চাহিদা মিটিয়ে থাকে। বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে চাষিরা বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ করেছেন। কিন্তু ভাঙা সড়কের কারণে পিকআপ ও ছোট ট্রাকের ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ায় চাষিরা লাভবান হতে পারছেন না।
এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা প্রকৌশলী আজিজুল হক বলেন, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কাজ শেষ করার সময় পার হওয়ার পর কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। বাকি কাজের জন্য শিগগিরই নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0