default-image

একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাত। তিনজন পাকিস্তানি সেনা স্টেনগান তাক করে কয়েকজন ছাত্রকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ছাদের দক্ষিণ দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। সেনারা হুংকার করে নির্দেশ দিল, ‘জয় বাংলা বাতাও।’ নির্দেশমতো তাঁরা উচ্চারণ করলেন, ‘জয় বাংলা।’ সঙ্গে সঙ্গে একঝাঁক গুলি ছোড়া হলো তাঁদের দিকে। গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া ছাত্ররা মৃত্যুযন্ত্রণায় হাত-পা ছুড়ছিলেন, কেউ কেউ তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। পরে পাকিস্তানি সেনারা ওই ছাত্রদের পা ধরে ছুড়ে ফেলে দিল ছাদ থেকে নিচে।

জগন্নাথ হলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ২৫ মার্চ রাতে হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তপন কে বর্ধন। বুধবার তিনি পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিচ্ছিলেন এভাবেই।

বুধবার বিকেলে টাঙ্গাইল শহরের বিশ্বাস বেতকা এলাকার বাসভবনে কথা হয় তপন কে বর্ধনের সঙ্গে। ১৯৭১ সালের মার্চে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সম্মান শ্রেণির চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থী। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। পরে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ২০০৮ সালে টাঙ্গাইলের সরকারি এম এম আলী কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর নিয়েছেন।

একাত্তরের ২৫ মার্চের হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা মনে হলে এখনো শিউরে ওঠেন তপন কে বর্ধন। তিনি জানান, ২৫ মার্চ সকাল থেকেই চারদিকে চাপা উত্তেজনা ছিল। হলের বেশির ভাগ আবাসিক ছাত্রই বাড়ি চলে যান। ডাইনিং বন্ধ থাকায় তিনি বাইরে রাতের খাবার খেতে যান। সেখানে রেডিওর খবর শুনে জানতে পারেন, ইয়াহিয়া ও ভুট্টো ঢাকা ত্যাগ করেছেন। শহরের লোকজনের মধ্যে বেশ গুঞ্জন ছিল, কিছু একটা হতে যাচ্ছে। হলে ফিরে ইংরেজি বিভাগের ছাত্র কার্তিক শীল ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র নিরঞ্জন হালদারের (ওই রাতে দুজনেই শহীদ) সঙ্গে কিছুক্ষণ এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। পরে ১১৯ নম্বর কক্ষে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।

বিজ্ঞাপন

রাত ১২টা বা সাড়ে ১২টার দিকে পরিসংখ্যান বিভাগের ছাত্র নারায়ণ রুদ্র পালের ডাকে তপন কে বর্ধনের ঘুম ভেঙে যায়। তিনি নিচে নেমে দেখেন, মৃণাল বোস, সুনীল, গণপতি, সুরেশ দাসসহ কয়েকজন ছাত্র দাঁড়িয়ে আছেন। ইতিমধ্যে চারদিক থেকে গোলাগুলির আওয়াজ আসতে থাকে। তাঁরা ইকবাল হলের (শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) দিকে রওনা হন ছাত্রনেতাদের কাছে কিছু জানার জন্য। ততক্ষণে ওই হলে পাকিস্তানি সেনারা গুলিবর্ষণ শুরু করে। একপর্যায়ে মাঠের পূর্ব দিক দিয়ে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা শুরু হয়। বিকট আওয়াজে সবাই এদিক–ওদিক দৌড়ে পালায়।

হলের কর্মচারী সীতানাথের সঙ্গে তপন কে বর্ধন সীতানাথের কোয়ার্টারে গিয়ে ঢোকেন। তাঁর সঙ্গে আরও দুই ছাত্র এসে সেখানে আশ্রয় নেন। ততক্ষণে চারদিকে প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হয়। পাকিস্তানি সেনারা হ্যান্ডমাইকে বলতে থাকে, ‘সারেন্ডার, সারেন্ডার, অর ইউ উইল ডাই।’ হলে ঢুকে শুরু হয় তাদের তাণ্ডব। লুকিয়ে থাকা অবস্থায় বুঝতে পারেন, সৈন্যরা হলের কক্ষে, শৌচাগারে, কার্নিশে খুঁজে খুঁজে ছাত্রদের ধরে হত্যা করছে। ভোর হওয়ার পর জানালা দিয়ে দেখতে পান ছাদের ওপর মৃণাল বোসসহ কয়েকজনকে গুলি করে টেনেহিঁচড়ে নিচে ফেলে দিতে।

দুপুর ১২টার দিকে দুজন এতিম ছেলের (ওরা হলে ছাত্রদের কাজকর্ম করে জীবিকা নির্বাহ করত) মাধ্যমে তপন কে বর্ধন ও অন্যরা জানতে পারেন, পাকিস্তানি সেনারা চলে গেছে। তিনি হামাগুড়ি দিয়ে বের হয়ে হলের সামনে স্তূপ করে রাখা লাশ দেখতে পান। পরে তিনি দেয়াল টপকে কয়েকজন শিক্ষকের বাসায় যান। কিন্তু তাঁরা তাঁকে সেখানে থাকা নিরাপদ হবে না বলে জানান। পরে পাশেই উদয়ন স্কুলের একটি খালি রুমে গিয়ে আশ্রয় নেন।

পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতার প্রত্যক্ষদর্শী তপন কে বর্ধন বলেন, ২৬ মার্চ সন্ধ্যার পর পাকিস্তানি সেনারা আবার আসে জগন্নাথ হলে। তারা আগের রাতে হত্যা করা ছাত্রদের লাশগুলো হলের মাঠে গণকবর দেয়। পরদিন কারফিউ প্রত্যাহার হলে তপন কে বর্ধন আবার জগন্নাথ হলে যান। হলের সিঁড়ি, মেঝে ছিল রক্তাক্ত। প্রতিটি কক্ষই তাঁর কাছে কসাইখানা মনে হচ্ছিল। এগুলো দেখার পর তপন কে বর্ধন বের হয়ে পড়েন হল থেকে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন