তথ্য সংগ্রহকারী বৃষ্টি বেগমের দায়িত্ব ছিল ১৩৬টি খানা বা পরিবারের তথ্য নিবন্ধন করা। প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ১২২টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছেন। বাকি ১৪টি পরিবারের কেউ বাড়িতে ছিলেন না। আবার কেউ কেউ বাসা বদল করে চলে গেছেন।

গণনার বিষয়ে জানতে চাইলে বৃষ্টি বেগম বলেন, গণনা কাজে কারও ঘর থেকে মন খারাপ করে ফিরতে হয়নি। প্রায় সবাই আগ্রহ করে তথ্য দিয়েছেন। কেউ কেউ শুধু তথ্য দিয়েই সহযোগিতা করেননি, সেই সঙ্গে খেতেও দিয়েছেন।

আরেক গণনাকারী ইফতেখার হোসেন। ১৬৮টি খানার মধ্যে শেষ দিন এসে তিনি ১০৯টি খানার তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছেন। তিনি কাজ করেছেন চণ্ডীবের সওদাগর বাড়ি এলাকায়। এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ। ঘড়িতে যখন বেলা ১১টা ৩০ মিনিট, তখন তিনি ১১০ নম্বর খানার গৃহকর্ত্রী মিনারা বেগমের কাছ থেকে তথ্য নিচ্ছিলেন। তথ্য দেওয়া শেষ করার পর গণনাকারীর কাছে মিনারা আক্ষেপ করে বলেন, সরকার কেবল লিখেই নেয়, বিনিময়ে তেমন কিছু দেয় না।

সাত দিনের তথ্য সংগ্রহের অভিজ্ঞতার বিষয়ে ইফতেখার হোসেন বলেন, সব ঠিকই আছে। তারপরও কিছু মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ প্রশ্ন তাঁকে বিব্রত করেছে। বিশেষ করে যাঁদের ঘরে রান্নার গ্যাস নেই, তাঁরা জানতে চেয়েছেন সরকার গ্যাস দেবে কখন? করোনার সময় অনেকে নাম লিখে গেছেন, কিন্তু শেষে আর অনুদান দেননি। জিজ্ঞাসা, এবারও একই অবস্থা হবে কি না? কেউ কেউ সরকারের কাছ থেকে বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার জন্য টিউবওয়েল দাবি করেন। ঘরও চেয়ে বসেছেন কয়েকজন।
বেলা একটার কিছু পর সাক্ষাৎ হয় আবদুর রহিম নামে এক গণনাকারীর সঙ্গে। তখন তিনি চণ্ডীবের মোল্লা বাড়ি এলাকায় ১০৪ নম্বর খানার মোস্তফা আলীর ঘর থেকে তথ্য সংগ্রহের কাজ করছিলেন। গৃহকর্ত্রী কুলসুম বেগমের জানতে চাওয়া, মাথা গুনে সরকারের লাভ, তাঁর লাভ কী?

গণনাকারী আঞ্জুমান বলেন, মজার বিষয় হলো, বয়স্ক ব্যক্তিরা জনশুমারি শব্দটির সঙ্গে পরিচিত নন। আদমশুমারি বলার পর বুঝতে পারেন। গণনাকারী সামিনা বিনতে শাহনেওয়াজ জানালেন, অনেকে আবার জনশুমারিকে মাথা গুনতি হিসেবে জানেন।
সমিতির কিস্তি নেওয়ার লোক ভেবে অনেকে ভুল করে বসেন বলে জানান গণনাকারী তামান্না বেগম। গণনাকারী রিমা বেগমের ভাষ্য, একজনের তথ্য সংগ্রহ শেষ হওয়ার আগেই অন্যজন বলে ওঠেন, আমার তথ্যটা নেন।

জনশুমারির জন্য কিশোরগঞ্জ জেলাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। ভৈরব আছে জেলাশুমারি-৩-এর অন্তর্ভুক্ত। আবার ভৈরব উপজেলাকে ভাগ করা হয় সাতটি জোনে।
default-image

বেলা পৌনে দুইটার দিকে চণ্ডীবের দক্ষিণ পাড়ায় দেখা হয় সুপারভাইজার নুরতাস শিপার সঙ্গে। তাঁর অধীনে সাতজন গণনাকারী কাজ করেছেন। মাঠের কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে নুরতাস শিপা বলেন, আগের জনশুমারির সঙ্গে এবারের পার্থক্য হলো, মাঠে চ্যালেঞ্জ কম। গণনাকারীদের সহজে গ্রহণ ও তথ্য প্রদানে আশাজাগানিয়া অগ্রগতি আছে। মূলত শিক্ষার হার বাড়া আর প্রযুক্তির আধিক্যের কারণে এমন ইতিবাচক পরিবর্তন বলে তাঁর বিশ্বাস।

উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জনশুমারির জন্য কিশোরগঞ্জ জেলাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। ভৈরব আছে জেলাশুমারি-৩-এর অন্তর্ভুক্ত। আবার ভৈরব উপজেলাকে ভাগ করা হয় সাতটি জোনে। প্রতি জোনে রাখা হয় একজন করে জোনাল কর্মকর্তা। ১২৬ জন সুপারভাইজারের অধীনে ৭৫২ জন গণনাকারী সাধারণ, প্রাতিষ্ঠানিক ও অন্যান্য খানা—এই তিন ক্যাটাগরিতে বাড়ি থেকে তথ্য তুলে আনেন। গণনাকারীদের বেশির ভাগ নারী। তথ্য নিবন্ধন করা হয় প্রযুক্তির মাধ্যমে। প্রতি গণনাকারীর হাতে ছিল একটি করে ট্যাব। গণনাকারী খানা সদস্যের ঘরে বসেই ট্যাবের মাধ্যমে তথ্য আপলোড দেন। পুরো কাজটি সমন্বয়ের জন্য আছে সাত আইটি সুপারভাইজার। উপজেলা শুমারি কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান।

কিশোরগঞ্জ জেলার শুমারি সমন্বয়কারী-৩ হিসেবে দায়িত্বে আছেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপপরিচালক মো. জুনায়েদ ভূঁইয়া। মঙ্গলবার দুপুরে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। মাঠপর্যায়ের কাজ নিয়ে তিনি বেশ তৃপ্ত। এই বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা, জনশুমারির কাজ ঘরে ঘরে পৌঁছানোর আগে প্রচারপর্বটি বেশ ভালোভাবে শেষ করা হয়েছিল। প্রশাসনিক সমর্থন ও সহযোগিতা ছিল অনেক ভালো। গণনাকারীদের ট্যাব, পোশাক ও পরিচয়পত্র দিতে পারায় মাঠপর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে এবার। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি কাজের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে খানা সদস্যদের সহযোগিতা আর গণনাকারীদের চেষ্টা, দুইয়ে মিলে তথ্য সংগ্রহের কাজটি বেশ ভালোভাবেই শেষ করা গেছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন