মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৫ জানুয়ারি হাইকোর্ট পার্বত্য চট্টগ্রামের অবৈধ ৬৪ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেন। এরপর আবার ১৪ মার্চ আদালত অপর এক আদেশে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অবস্থিত ১৩০টি অবৈধ ইটভাটা ছয় সপ্তাহের মধ্যে ধ্বংস করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। এর মধ্যে এই ৭টি ইটভাটাও রয়েছে।

প্রথম আদেশের পর স্থিতাবস্থা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন শুরু করেন সাত ইটভাটার মালিক। আবেদনে তাঁরা ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের বিভিন্ন তারিখে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম থেকে নেওয়া ছাড়পত্র সংযুক্ত করেন। ওই ছাড়পত্রগুলোতে সই রয়েছে সাবেক পরিচালক মো. নাজমুল হকের।

কিন্তু নাজমুল হক ২০০৭ সালের ২৪ জুলাই থেকে ২০০৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে এ ধরনের কোনো ছাড়পত্র দেওয়ার সত্যতা মেলেনি।

স্থিতাবস্থার জন্য রিট আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চারটি ইটভাটা ছয় মাসের স্থিতাবস্থা পায় ৭ মার্চ। বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি খন্দকার দিলীরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। এগুলো হলো এমবিএম ব্রিকস, আল মদিনা ব্রিকস, কাদের ব্রিকস (ইউনিট-২) ও খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি ব্রিকস।

বাকি তিনটি ইটভাটা এর আগে ২০ ফেব্রুয়ারি ছয় মাসের স্থিতাবস্থা পেয়েছে। এগুলো হলো জালালিয়া, আমেনা তাসপিয়া ও আশা ব্রিকস। তাঁরাও একই বেঞ্চ থেকে স্থিতাবস্থা পান।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের বর্তমান পরিচালক মুফিদুল আলম বলেন, যে সময়ে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে উল্লেখ রয়েছে তখন নাজমুল হক দায়িত্বে ছিলেন না।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, নাজমুল হক বছর দুয়েক আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হিসেবে অবসরে যান। জানতে চাইলে গত ২০ মার্চ দুপুরে নাজমুল হক মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০১৭ থেকে ২০২০ সালে আমার কোনো পরিবেশ ছাড়পত্র দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। তখন আমি চট্টগ্রামে ছিলাম না। যদি কেউ এ ধরনের ছাড়পত্র উপস্থাপন করে থাকে, তাহলে তা জাল।’

দুর্নীতিপরায়ণ ব্যবসায়ীরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে আদালতের সঙ্গে প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা করেছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
আখতার কবির চৌধুরী, সম্পাদক, চট্টগ্রাম, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

এদিকে ইটভাটার ছাড়পত্র দেওয়া হয় অধিদপ্তরের ছাড়পত্র কমিটির সভার মাধ্যমে। সভার নম্বরগুলো ক্রমিক অনুযায়ী প্রতিবছর সংখ্যায় বাড়তে থাকে। সাতটি ইটভাটা ভিন্ন ভিন্ন বছর ছাড়পত্র নিলেও সব কটির সভার নম্বর দেখানো হয়েছে ৩৭। এটা কোনোভাবে সঠিক নয় বলে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান।

এ বিষয়ে পরিবেশের উপপরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো বৈধ ছাড়পত্র পাহাড়ের ইটভাটা দেখাতে পারবে না।

ইটভাটার মালিকদের পক্ষে রিটগুলোর শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী সজল মল্লিক। জানতে চাইলে গতকাল রোববার রাতে মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাল ছাড়পত্রের বিষয়টি শোনার পর ৩ এপ্রিল হাইকোর্টে বাদীপক্ষ মামলা চালাতে চায় না বলে আবেদন করেছি। আদালত ডিসচার্জ ফর নন–প্রসিকিউশন আদেশ দেন। রিটগুলো খারিজ হয়ে গেছে।’

ইটভাটায় পুড়ছে কাঠ

আদালতের স্থিতাবস্থা পাওয়ার পর থেকে বনের কাঠ পুড়িয়ে চলছে ইটভাটাগুলো। রাঙামাটির কাউখালীতে অভিযুক্ত ইটভাটাগুলোর অবস্থান পাহাড় ও বনঘেরা সুগারমিল, আদর্শ গ্রাম ও তারাবুনিয়া এলাকায়। সম্প্রতি দেখা গেছে, আদর্শ গ্রামের মুখে মুছা মাতব্বরের আমেনা তাসপিয়া ব্রিকসটির চুল্লি দিয়ে ধোঁয়া উঠছে। একপাশে কাঁচা ইটের সারি। এক জায়গায় স্তূপ করে রাখা আছে বনের কাঠ। এই ভাটার পাশে আরও দুটি ইটভাটাও বনের কাঠ দিয়ে ইট পোড়াচ্ছে।

জানতে চাইলে তাসপিয়া ব্রিকসের মালিক ও রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মুছা মাতব্বর প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছয় মাসের স্থিতাবস্থা নিয়ে ইটভাটা চলছে। তাসপিয়া আমাদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান।’ স্থিতাবস্থা নেওয়ার জন্য জাল কাগজ জমা দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

ইট পোড়ানো আইন অনুযায়ী, পাহাড় ও বনাঞ্চলের আধা কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ইটভাটা থাকতে পারবে না। কিন্তু কাউখালীতে সচল থাকা সব কটি ইটভাটার অবস্থান বনের পাশে।

এ ব্যাপারে গতকাল রাতে মুঠোফোনে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘তাঁরা উচ্চ আদালত থেকে স্থিতাবস্থা এনে ভাটা চালাচ্ছিলেন। এখন নতুন আদেশ পেলে অভিযান চালানো হবে।’

আদালতে জাল ছাড়পত্র দাখিল করার বিষয়টি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী। তিনি বলেন, দুর্নীতিপরায়ণ ব্যবসায়ীরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে আদালতের সঙ্গে প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা করেছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।