সংবাদ সম্মেলনে মনিরুল ইসলাম বলেন, গত বছরের ৫ মে ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীর ফেইম অ্যাপারেলস লিমিটেড রপ্তানির জন্য ২ কোটি ৯০ লাখ ২৬ হাজার টাকা মূল্যের ১ লাখ ১৮ হাজার ৩২৯ টি পোশাক ‘বিবি খাদিজা ট্রান্সপোর্ট’ ও ‘ইম্পেরিয়াল ট্রান্সপোর্ট’-এর ভাড়া করা চারটি কাভার্ড ভ্যানে চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশে রওনা হয়। পরদিন ৬ মে চট্টগ্রাম বন্দরের সিঅ্যান্ডএফ সেই পোশাক গ্রহণ করে রপ্তানির জন্য ছাড় করে। দুই মাস পর ওই পণ্যের জার্মান ক্রেতা বাংলাদেশের ফেইম অ্যাপারেলস কর্তৃপক্ষকে জানায়, তাদের কাছে ৩০ হাজার পিস কম পণ্য এসেছে। এ ঘটনায় গত বছরের ১৩ জুলাই ফেইম অ্যাপারেলসের পক্ষে কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি মামলা করেন। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি পিবিআই মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব নেয়। পরে তদন্ত কর্মকর্তা বাতেন মিয়া নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মিরপুর, সাভারের বিরুলিয়া এবং চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও ফটিকছড়ি এলাকায় টানা ১১ দিন অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ চোর চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেন।

মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার আসামিরা জানিয়েছেন, চক্রের মূল হোতা সোহেলের নির্দেশনায় ২০ হাজার টাকা করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একেকজন কাভার্ড ভ্যানচালককে রাজি করান আসামি রায়হান। পরে শিপমেন্টের জন্য পোশাক কারখানা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হওয়া কাভার্ড ভ্যান সোনারগাঁয়ে আসামি বিল্লাল হোসেনের গুদামে নিয়ে যায়। সেখানে সিল ও ট্যাগ অক্ষত রেখে কাভার্ড ভ্যানের দরজার সিটকিনির নাট খুলে রপ্তানির এক-তৃতীয়াংশ পণ্য নামিয়ে রাখেন। প্রতিটি কাভার্ড ভ্যান থেকে গুদামে মাল নামিয়ে রাখার জন্য বিল্লালকে পাঁচ হাজার টাকা দেন সোহেল। জিজ্ঞাসাবাদে বিল্লাল জানিয়েছেন, প্রতি মাসে তাঁর গুদামে সোহেল পাঁচ থেকে ছয়টি ট্রাক নিয়ে পণ্য নামিয়ে রাখতেন।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, মামলার তদন্তকালে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার ও মাতুয়াইল এলাকায় পিবিআই কাভার্ড ভ্যান থেকে গার্মেন্টস পণ্য সরানোর একাধিক গোপন গুদামের সন্ধান পেয়েছে। কার্টন থেকে পোশাক চুরির পর ওজন ঠিক রাখতে আসামিরা কার্টনের ভেতরে সমপরিমাণ ঝুট (পরিত্যক্ত কাটা কাপড়) ভরে সেগুলো প্যাকিং করে কাভার্ড ভ্যানে উঠিয়ে দিতেন। ওজন ঠিক থাকায় সিঅ্যান্ডএফ চট্টগ্রাম বন্দরে পোশাক চুরির বিষয়টি ধরতে পারত না এবং রপ্তানির ক্লিয়ারেন্স দিয়ে দিত।

পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা বলেন, আসামি বিল্লালের গুদাম থেকে চুরির মালামাল অপর আসামি রায়হানের মাধ্যমে চক্রের মধ্যস্থতাকারী কাউছারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরে কাউছার মূল হোতা সোহেলের মিরপুরের গুদামে পৌঁছে দিতেন। আসামি সোহেল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেসব পণ্য বিমানে মালয়েশিয়ার পেনাং, হাংকুয়া, কুয়ালালামপুরে পাঠিয়ে দিতেন। অভিযানকালে সোহেলের মিরপুর গুদাম থেকে বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাক জব্দ করা হয়। জব্দ করা পোশাকের কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি সোহেল। এ ঘটনায় পিবিআই বাদী হয়ে রাজধানীর পল্লবী থানায় সোহেলকে আসামি করে মামলা করে।

মনিরুল ইসলাম বলেন, রপ্তানিযোগ্য তৈরি পোশাক চুরি হওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে গার্মেন্টস মালিকদের সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। দেশের গার্মেন্টস মালিকদের প্রতি বিদেশি ক্রেতাদের আস্থাহীনতা ও দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি শিপমেন্ট বাতিলসহ নানা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে পোশাক খাত। সংঘবদ্ধ চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, চোর চক্রের কারণে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। দেশের অর্থনীতির ক্ষতির পাশাপাশি দেশের মানসম্মান নষ্ট হচ্ছে। তাই এ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে স্পেশাল অ্যাক্টের মাধ্যমে তাদের বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে।