আলাপে আলাপে জানা গেল, জিয়াউরের বাড়ি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের ঘষিয়াখালীতে। বয়স এখন ৪০ বছর। জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় কাটিয়েছেন নদীতে নদীতে। ১৯৯৯ সালে এসএসসি পাসের পর সংসারের অনটনে পড়ালেখা আর এগোয়নি। কয়েকটা চাকরির জন্য চেষ্টা করেও বিফল হওয়ায় বেছে নেন এই নদীজীবন।

জিয়াউর বললেন, ‘ঘোষিয়াখালী মোহনায় আমাদের বাড়ি। বাড়ির পাশে লঞ্চঘাট ছিল। ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফিরেই ঘাটে যেতাম, লঞ্চে উঠতাম। লঞ্চ থেকে ঝাঁপিয়ে নদীতে পড়তাম। লঞ্চের লোকজনের সঙ্গে গল্প হতো। সব মিলিয়ে নদীর এই জীবন একেবারে অচেনা ছিল না। ম্যাট্রিক পাসের পর বিভিন্ন চাকরির চেষ্টা করে দেখলাম, হচ্ছে না। বুঝলাম, এটাই সহজ পথ। বিনা পয়সায় চাকরি পাওয়া যায়। এরপর লস্কর (ধোয়ামোছা, দেখভাল করা) হিসেবে কাজ শুরু।’

জিয়াউরদের গ্রামের অনেক মানুষ এখন এই পানিতে পানিতে কাটানোর জীবন বেছে নিয়েছেন। আগে তাঁদের এলাকা খুব অনুন্নত ছিল, অভাব ছিল। মানুষ ভবন নির্মাণের সঙ্গে বেশি জড়িত ছিলেন। তবে ঠিকাদারদের কাছে বারবার প্রতারিত হয়ে আস্তে আস্তে মানুষ এ জীবনে প্রবেশ ঢুকতে থাকেন। গ্রামে একজনের দেখাদেখি আরেকজন—এইভাবে অনেকেই এ পেশায় জড়িয়ে পড়েন। তাঁদের পাড়ার নামই এখন হয়ে গেছে মেরিন মাস্টার পাড়া।

চট্টগ্রামে চাকরির সময় ওই সব রুটে যে রোলিং হতো, তাতে মাঝেমধ্যে মনে ভয় ধরত। আর বাড়ির জন্য মন পুড়ত।
জিয়াউর রহমান, লঞ্চের মাস্টার

দুই বছর লস্করের চাকরির পর জিয়াউর সুকানি (চালক) হতে পেরেছিলেন। সুকানি হিসেবে কাজ করেন ২০১৬ পর্যন্ত। এর পর থেকে গত ছয় বছর মাস্টার হিসেবে আছেন। জিয়াউরের লস্কর আর সুকানি জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে চট্টগ্রাম-ভোলা আর চট্টগ্রাম-হাতিয়া রুটে। ওই রুটে প্রচণ্ড রোলিং ভয় জাগাত মনে। নিজের বাড়ি থেকে দূরে হওয়ায় বাড়ির জন্যও ভীষণ মন পুড়ত। তবে জলজীবনে ভয়কে জয় করে কাজ করে যেতে হয়েছে।

জিয়াউর বলেন, ‘এখানে শান্ত নদী। শুধু ঝড়-বৃষ্টি মোকাবিলা করতে হয়। তবে চট্টগ্রামে চাকরির সময় ওই সব রুটে যে রোলিং হতো, তাতে মাঝেমধ্যে মনে ভয় ধরত। আর বাড়ির জন্য মন পুড়ত। তবে মন পড়লেই তো আর যাওয়া সম্ভব নয়। কর্মময় জীবন। জীবিকা নির্বাহের জন্য অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়।’

বাড়িতে জিয়াউরের চার মাস বয়সী ছেলে, ছয় বছর বয়সী মেয়ে, স্ত্রী আর বৃদ্ধা মা থাকেন। বছরে আনুষ্ঠানিক ছুটি মেলে ৪৫ দিন। তবে অসুস্থ মা, সন্তান আর স্ত্রীকে দেখতে মাঝেমধ্যে বাড়িতে যেতে হয়। যখন বাড়িতে যান, তখন বদলি হিসেবে অন্য আরেকজন মাস্টারকে রেখে যেতে হয়। ওই সময়ের বেতন তাঁকেই দিতে হয়।

জিয়াউরের কথামতো, প্রতিদিন ট্রিপ থাকে। সব সময় নদীর ওপরেই থাকতে হয়। পরিবারের জন্য মন খারাপ হয়। বাড়িতে গেলে সেই কয়েক দিনের আবার বেতন মেলে না। বদলি হিসেবে যাঁদের দিয়ে যেতে হয়, কমপক্ষে সাত দিনের কম হলে তাঁরা আবার দায়িত্ব নিতে রাজি হন না। এ জন্য একবার বাড়িতে গেলে কম করে সাত দিনের বেতন পাওয়া যায় না। সব মিলিয়ে সমস্যা।

মাসে ১২ হাজার টাকার মতো বেতন পান মাস্টাররা। দ্রব্যমূল্যের এ চড়া বাজারে তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাঁদের। জিয়াউর বলেন, ‘সংসার চালানো খুবই কষ্ট। ধরেন, পরিবার দূরে রেখে এত সময় দিই; তারপরও প্রতিদিনের বেতন ৪০০ টাকা। চাল, ডাল, তেল, ওষুধ কিনে কোনোভাবেই এটা দিয়ে চলা সম্ভব নয়। প্রতি মাসে ঋণ হচ্ছে।’ এসব কথা বলার মাঝে কিছুটা উদাসীন হয়ে পড়েন জিয়াউর। হয়তো কোনো দুশ্চিন্তা ভর করে। আনমনে নদীর দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘যাব কোথায়? আমি যে কাজ শিখেছি, এর বাইরে তো কিছু পারব না। না পারব ভ্যান চালাতে, না পারব মাটি কাটতে। এখন এটাই করতে হচ্ছে।’

এখনো মন কাঁদে আজিজের

বাড়িতে রাগারাগি করে ১৫-১৬ বছর বয়সে নড়াইলের লোহাগড়া থেকে খুলনায় আসেন আবদুল আজিজ (৫০)। ৩৫ বছর ধরে লঞ্চে কাজ করছেন। এখন কর্মরত সুকানি পদে। তিনি বলেন, একসময় এখান থেকে ২০-২২টি রুটে লঞ্চ চলত। শুধু দক্ষিণের দিকেই যেত ১৭-১৮টির ওপর লঞ্চ। লঞ্চঘাট সব সময় জমজমাট থাকত। কিছুক্ষণ পরপর লঞ্চ ছেড়ে যেত, ঘাটে এসে ভিড়ত। টানাপোড়েন থাকলেও মনে আনন্দ ছিল। পরিবার ছেড়ে থাকার কষ্ট ভুলে থাকা যেত।

আজিজ আরও বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের উৎপাদিত মাছ পরিবহন আর মানুষ চলাচলের প্রধান ও একমাত্র উপায় ছিল লঞ্চগুলো। নদী ভরাট আর যাত্রীর অভাবে রুটগুলো একে একে বন্ধ হয়েছে। এখন সড়ক যোগাযোগ ভালো হয়েছে। আবার মাছের উৎপাদন কমেছে, নদীতে চর পড়েছে। এখন সবকিছুতেই মন্দা। এখন রকেট ঘাট থেকে দুইটা আর আইডব্লিউ ঘাট থেকে দুইটা মোট চারটা যাত্রীবাহী লঞ্চ জোড়শিং ও পাতাখালি গাবুরার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। অন্য সব রুট বন্ধ।