মূল শহর ছাড়িয়ে নগরের বর্ধিত ওয়ার্ডগুলোর বিভিন্ন এলাকা যেমন হরিণাফুলিয়া, নবগ্রাম কিংবা পুরাণপাড়া, অথবা কীর্তনখোলা নদীর পূর্বপাড়ে কর্ণকাঠি, তালুকদারহাট কিংবা চরমমোনাই এলাকায় এখনো ভাঁটফুল ফোটে, আবার নীরবে ঝরে যায়। শুধু বরিশাল না, গোটা দক্ষিণাঞ্চলের বনবাদাড়েই এই ফুল এখনো টিকে আছে, সৌরভ ছড়াচ্ছে।

বরিশাল-কুয়াকাটা, বরিশাল-খুলনা কিংবা বরিশাল থেকে বরগুনা অথবা বানারীপাড়া বাবুগঞ্জ যেতে সড়ক ও মহাসড়কের দুই পাশে দেখা মেলে এই ফুলের বিপুল সমাহার। পিচঢালা পথ ধরে যেতে যেতে চোখ মেললে এই ফুলের উজ্জ্বল মনোমুগ্ধকর উপস্থিতি চোখ জুড়িয়ে দেয়। গুচ্ছ গুচ্ছ ভাঁটফুলের হাসি কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় চিত্রিত এই ফুলের বিমুগ্ধতারই জানান দেয়। ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ কবিতায় তিনি লিখেছিলেন এভাবে— ‘বাংলার নদ–নদী–ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়।’ কিংবা ‘কোথাও মঠের কাছে’ কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, ‘জারুল গাছের তলে রৌদ্র পোহায়/রূপসী মৃগীর মুখ দেখা যায়/—শাদা ভাঁট পুষ্পের তোড়/আলোকতার পাশে গন্ধ ঢালে দ্রোণফু বাসকের গায়।’

যেন পথের পাশে ফুলের ডালি নিয়ে পথিককে স্বাগত জানাচ্ছে ভাঁটফুলের গুচ্ছ। এই ফুল দিনে তার শোভা মেলে ধরে, আর রাতে বিলায় সুগন্ধ। ভোরে শিশির গায়ে মেখে ভাঁটফুল যেন আরও মোহনীয় হয়ে শোভা ছড়ায়। স্নিগ্ধ শোভার সুরভিত ভাঁটফুলের রূপসুধায় আকৃষ্ট হয়ে ছুটে আসে পাখি ও পতঙ্গ। ভ্রমর খেতে আসে এই ফুলের মধু।

ছোট আকৃতির নরম শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট ঝোপজাতীয় গুল্মশ্রেণির বহু বর্ষজীবী সপুষ্পক উদ্ভিদ এটি। গাছগুলো সাধারণত দুই থেকে চার মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতা দেখতে কিছুটা পানপাতা আকৃতির, তবে মসৃণ নয় রুক্ষ ও খসখসে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভাঁটফুল দিয়ে ভাঁটি পূজার আয়োজন করেন।

ধবধবে সাদা রঙের ফুলে পাঁচটি করে পাপড়ি থাকে। পাপড়ির গোড়ায় থাকে সামান্য বেগুনি রঙের প্রলেপ। ফুলের কেন্দ্র থেকে চারটি করে তিন সেন্টিমিটার লম্বা মঞ্জুরি (পুংকেশর) ফুলের সামনের দিকে বেরিয়ে আসে, সামনের অংশে থাকে কালো দানার মতো।

বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাছমিন সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, নিবিড়ভাবে পরখ করলে ভাঁটফুলের রূপ ও সৌন্দর্য বোঝা যায়। বুনোফুল যে কত সুন্দর হতে পারে, তা দেখলেই বোঝা যায়। বাংলার অপরূপ প্রকৃতির অংশ ভাঁটফুল আগে সব জায়গায় ছিল। কিন্তু এখন নগরায়ণের প্রভাবে এটি গ্রামের ঝোপঝাড়, বনবাদাড়ে টিকে আছে। ভাঁটফুল মূলত দক্ষিণ এশিয়ার নিজস্ব একটি উদ্ভিদ। এর আদি নিবাস বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার। কিছু ঔষধি গুণও আছে এই উদ্ভিদের।