বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জেলা প্রশাসনের হিসাবে, বরগুনায় প্রায় ৯ লাখ মানুষের বাস। এখানকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস ধান ও মাছ। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এর বাইরে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। সরকারও সেদিকে নজর দিচ্ছে না। এতে উপকূলীয় এ জেলায় জীবিকার হাহাকার চেপে বসেছে। একই সঙ্গে বাড়ছে দারিদ্র্য।

বরগুনা সদর, আমতলী ও পাথরঘাটা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জেলে, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, এনজিও কর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন দুর্দশার কথা জানা গেল।

২০২০ সালে বাংলাদেশ জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং আইসিডিডিআরবি এক যৌথ গবেষণার তথ্য দিয়ে বলেছিল, বরগুনার দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। এই জরিপ অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য এখন বরগুনার পাশের জেলা পটুয়াখালীতে। দ্বিতীয় দারিদ্র্যের জেলা কুড়িগ্রাম। তৃতীয় দারিদ্র্যপ্রবণ জেলার তালিকায় রয়েছে বরগুনা। ওই গবেষণায় দেশের দরিদ্র মানুষের অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে পারিবারিক আয় ছাড়াও ঘরের অবস্থা, বিদ্যুৎ-সংযোগ আছে কি না, বাড়িতে শৌচাগার কী ধরনের, বাসার ধরন কেমন, টেলিভিশন ও মুঠোফোন আছে কি না—এসব বিষয়কে সূচক হিসেবে নেওয়া হয়েছিল।

অবশ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয়–ব্যয় জরিপ ২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনায় প্রতি ১০০ জনের মধ্যে দারিদ্র্যসীমার নিচে প্রায় ২৬ জন বাস করেন। ২০১৭ সালে এ তথ্য প্রকাশের পর সরকারিভাবে বরগুনার দারিদ্র্য নিয়ে আর কোনো সমীক্ষা হয়নি।

বরগুনার জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান অবশ্য জেলায় ৫৪ শতাংশ মানুষ দরিদ্র—এমন তথ্য মানতে চাইলেন না। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা ঠিক, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে উপকূলের কৃষি খাত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাগরে মাছ ধরা ও মা ইলিশ রক্ষার নিষেধাজ্ঞার সময়ও জেলেদের জন্য পর্যাপ্ত বিকল্প কর্মসংস্থান এখনো তৈরি হয়নি।

তাঁরা কৃষকদের লবণসহিষ্ণু ফসল উৎপাদনে উৎসাহিত করছেন।
আবু সায়েদ মোহাম্মদ জোবায়দুল আলম, জেলা কষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক

তারপরও এত দারিদ্র্য নেই।’ তাঁর ভাষ্য, জেলার দরিদ্র মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চলছে। আর উপকূলীয় জেলা হওয়ায় বরাদ্দও বেশি থাকে।

তবে বরগুনার সাধারণ মানুষের কাছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও সরকারি বরাদ্দে অনিয়ম ও অপ্রতুলতার অভিযোগ শোনা গেল। সদর উপজেলার ডালভাঙ্গা গ্রামের জেলে মনির হোসেন বলেন, চার মাসব্যাপী জাটকা আহরণ বন্ধে দুই মাসে তাঁর ৮০ কেজি চাল পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পেয়েছেন ৬৪ কেজি। অন্যদিকে বদরখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ইউনুস মিয়া নিবন্ধিত জেলে হলেও জাটকা আহরণ বন্ধকালীন সরকারি খাদ্যসহায়তা পাননি।

সদর উপজেলার বালিয়াতলী ইউপি চেয়ারম্যান নাজমুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, জেলের সংখ্যার চেয়ে খাদ্যসহায়তার বরাদ্দ কম হওয়ায় তাঁরা সবাইকে দিতে পারেন না।

বাড়ছে অভাব

জেলার স্থায়ী বাসিন্দারা বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিডর, আইলা, মহাসেন, ফণী, আম্পানসহ অনেক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হয়েছে। এতে উপকূলীয় এলাকা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্বল বাঁধ ও অব্যবস্থাপনার কারণে কৃষিজমিতে লোনাপানি ঢুকে পড়ার পরিমাণ বাড়ছে।

স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, সারা বছর লবণাক্ততার কারণে বরগুনায় বোরো ধান, সবজিসহ অন্যান্য ফসল কম হয়। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি বেড়ে গেলে লবণাক্ততা কমে আসে। তখন সেখানে আমন ধানের চাষ হয়। লবণাক্ততার পাশাপাশি অনাবৃষ্টির কারণেও ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। আমতলী পৌরসভার নয়াবাঙ্গালি এলাকার কৃষক আলম শিকদার বলেন, এ মৌসুমে বৃষ্টি কম হওয়ায় মুগ ডাল ও তরমুজের ফসল ভালো হয়নি।

তবে গত কয়েক বছরে মুগ ডাল ও তরমুজ উৎপাদন বেড়েছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ। জেলা কষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু সায়েদ মোহাম্মদ জোবায়দুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা কৃষকদের লবণসহিষ্ণু ফসল উৎপাদনে উৎসাহিত করছেন।

কৃষির চেয়ে বরগুনার সাধারণ মানুষের নদী ও সাগরে মাছ ধরা ও মৎস্যকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকেই ঝোঁক বেশি। মৎস্য বিভাগের হিসাবে, জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও এনজিও প্রতিনিধিরা বলছেন, এ সংখ্যা দ্বিগুণ হবে।

আমতলী উপজেলার স্থানীয় এনজিও নজরুল স্মৃতি সংসদের (এনএসএস) নির্বাহী পরিচালক শাহাবুদ্দিন পান্না বলেন, টানা ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা থাকে। ওই সময় জেলেদের স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে জেলেরা ঋণী হচ্ছেন ও দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছেন।

বরগুনা সদর, আমতলী ও পাথরঘাটার অন্তত ২৫টি জেলে পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মোটামুটি প্রতিটি জেলে পরিবারই ঋণগ্রস্ত। কেউ একাধিক এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন। তবে জেলেদের মধ্যে মহাজনী দাদন নেওয়ার প্রবণতাও রয়েছে।

ইলিশ প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময়ও জেলেদের হাতে কাজ থাকে না। স্থানীয় জেলে বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘সরকার জেলেদের মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেয়। কিন্তু ৩০ কেজি চালে ৫ সদস্যের কয় দিন চলে?’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ ছাড়া বেশির ভাগ এনজিওর অন্যান্য কর্মসূচি বন্ধ। তালতলী উপজেলায় বেসরকারিভাবে নির্মাণাধীন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া জেলায় দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন প্রকল্প নেই।

‘মোগো কাম লাগবে’

গত ২২ এপ্রিল বিকেলে আমতলী পৌরসভার নয়াবাঙ্গালি গ্রামের ১৫ জন নারী-পুরুষের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁদের একজন ফরিদা আক্তার। তাঁর স্বামী দিনমজুর। দুই মেয়ে লেখাপড়া করে। ফরিদা গৃহস্থালি সামলান। মাঝেমধ্যে অন্যের কাজ করেন। ফরিদা কবে মাংস রান্না করেছেন, তা বলতে পারলেন না। তবে জানালেন, দুই মাস আগে এক বাড়িতে দাওয়াতে গিয়েছিলেন, সেখানে সর্বশেষ মাংস খেয়েছেন।

নয়াবাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সীমিত আয়ের সংসারে তাঁদের হিসাব মিলছে না। ইমরান মাঝি ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘ব্যাবাকে (সবাই) কয় মোগো আয় বাড়ছে। হেরা কি দ্যাহে না আডে (বাজার) আইয়্যা মোরা কী কিনি।’

পাথরঘাটার পদ্মা গ্রামের বাসিন্দারা জানান, তাঁরা বেশির ভাগ সময় নগদ টাকায় খরচ করতে পারেন না। গ্রামের দোকানে বাকিতে কেনেন। এতে জিনিসপত্রের দাম আরও বেশি পড়ে।

পাথরঘাটার বলেশ্বর নদের বাঁধ ধরে চলতে চলতে দেখা গেল, কর্মহীন জেলেদের কেউ রাস্তার পাশে টংদোকানে বসে অলস সময় পার করছেন। পশ্চিম চরলাঠিমারা বেড়িবাঁধসংলগ্ন ফাতিমা বেগম বললেন, ‘মোগো কাম লাগবে। কাম ছাড়া মোরা কী লইয়া বাঁচমু।’

বরগুনা পৌর বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, স্বর্ণা জাতের চিকন চালের কেজি ৬০ থেকে ৬৮ টাকা। মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকায়। এ ছাড়া মসুর ডালের কেজি (মোটা) ১০০ টাকা ও চিকন ১৩০ টাকা, মুগ ডাল ১৪০, খোলা আটা ৩২, ছোলা বুট ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়।

সারা দেশের মতো টিসিবির মাধ্যমে বরগুনা জেলায় ৬৩ হাজার ২৬৫ পরিবারের মধ্যে দুই ধাপে দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি চিনি ও দুই কেজি করে মসুর ডাল সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রি করা হয়েছে। পুরো প্যাকেজের দাম ধরা হয়েছে ৪৫০ টাকা। নয়াবাঙ্গালি গ্রামের অন্তত আটজন নারীকে টিসিবির পণ্য কিনেছেন কি না জিজ্ঞেস করলে ছয়জনই বলেন, তাঁরা টিসিবি পণ্য কেনার টাকা জোগাড় করতে পারেননি।

সচেতন নাগরিক কমিটির জেলা কমিটির সভাপতি আনিসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বরগুনা জেলায় দারিদ্র্য ‍বৃদ্ধির প্রবণতা রোধ করতে হলে প্রথমত কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষিভিত্তিক ও মৎস্যভিত্তিক শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো ও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলার মাধ্যমে দারিদ্র্য বৃদ্ধির এ ধারা থামানো সম্ভব।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন মোহাম্মদ রফিক, বরগুনাআমিন সোহেল, পাথরঘাটা]

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন