বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মামলাসংশ্লিষ্ট একাধিক আইনজীবী জানান, সাক্ষ্য প্রদানের সময় হাফেজ মো. আমিন আদালতে বলেছেন, সেদিন রাতে তল্লাশিচৌকির পাশে পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলীর গুলিতে সিনহা মাটিতে (সড়কে) পড়ে ছটফট করছিলেন। প্রাণ বাঁচানোর জন্য পানির জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন। লিয়াকত আলী সিনহার দিকে গিয়ে বুকে লাথি মারেন কয়েকবার। পা দিয়ে মাথাও চেপে ধরেন। এর কিছুক্ষণ পর টেকনাফের দিক থেকে সাদা মাইক্রোবাস নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান প্রদীপ কুমার দাশ (টেকনাফ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা)। তখনো সিনহা জীবিত ছিলেন এবং ‘পানি পানি’ করছিলেন। ওসি প্রদীপ তখন লাথি মারেন এবং পা দিয়ে গলা চেপে ধরে সিনহার মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাফেজ মো. আমিনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফরিদুল আলমের নেতৃত্বে তিনজন আইনজীবী। এরপর আসামিপক্ষের অন্তত ১৩ আইনজীবী তাঁকে জেরা করেন। সাক্ষ্য গ্রহণের সময় আদালতের কাঠগড়ায় ছিলেন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ১৫ জন আসামি। আদালত পরিচালনা করেন জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল।

default-image

আইনজীবীরা জানান, মঙ্গলবার সকাল ১০টায় শুরু হয় আদালতের বিচারকার্য। সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আদালতে হাজির করা হয় তিনজন সাক্ষী—হাফেজ মো. আমিন, মো. শওকত হোসেন ও মো. সাইফুলকে। শুরুতে সাক্ষ্য দেন হাফেজ মো. আমিন। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করে দুপুরে শুরু হয় আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জেরা। বেলা দুইটায় এক ঘণ্টার বিরতি দিয়ে তিনটায় শুরু হয় আবার জেরা। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত আসামিপক্ষের অন্তত ১৩ জন আইনজীবী হাফেজ মো. আমিনকে জেরা করেন। এরপর বিচারকার্য মুলতবি করা হয়। বুধবার (৮ সেপ্টেম্বর) পুনরায় সাক্ষ্য গ্রহণ চলবে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পিপি ফরিদুল আলম বলেন, আজ মঙ্গলবারও একজন মাত্র সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জেরা সম্পন্ন হয়েছে। আসামিপক্ষের অন্তত ১৩ জন আইনজীবী জেরার নামে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করছেন। এতে বিচাকাজে দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে। গত ২৩ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া দুই দফার ছয় দিনে মাত্র পাঁচজন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এই মামলার মোট সাক্ষী ৮৩ জন।

আদালত সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জেরার সময় প্রদীপ কুমার দাশের আইনজীবী রানাদাশ গুপ্ত হাফেজ মো. আমিনকে মিয়ানমারের অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা বলে দাবি করেন। হাফেজ আমিন তা সত্য নয় দাবি করে বলেন, তিনি টেকনাফের স্থায়ী বাসিন্দা। একই সময় রানাদাশ গুপ্ত জেলা কারাগারের অভ্যন্তরে আসামি ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে সুযোগ–সুবিধা (ডিভিশন) দেওয়া হচ্ছে না জানিয়ে আদালতে আরেকটি নালিশি আবেদন করেন।

সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবী রানাদাশ গুপ্ত সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আজকে (মঙ্গলবার) হাফেজ মো. আমিন নামে যাঁকে সাক্ষ্য দিতে আনা হয়েছে, তিনি মিয়ানমারের অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা। তিনি যে মসজিদের ইমাম বলে দাবি করছেন, তা–ও সত্য নয়। জেরার সময় ওই মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি-সেক্রেটারির নামও বলতে পারেননি এই সাক্ষী। মূলত একটি স্বার্থান্বেষী মহল শেখানো কথা বলার জন্য বিভিন্ন লোকজনকে নিয়ে আসছে।

এ প্রসঙ্গে বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর সাংবাদিকদের বলেন, সাক্ষীদের অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে জেরা করে মূলত আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সময়ক্ষেপণ করছেন। সাক্ষীদের মধ্যে কে সিএনজিচালক, কে মসজিদের ইমাম তার প্রমাণ নিতেই ব্যস্ত তাঁরা।

আইনজীবীরা জানান, গত সোমবার (৬ সেপ্টেম্বর) আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন মামলার ৯ নম্বর সাক্ষী মো. কামাল হোসেন। আগের দিন রোববার (৫ সেপ্টেম্বর) সাক্ষ্য দিয়েছেন মামলার ৩ নম্বর সাক্ষী মোহাম্মদ আলী। দুজনের বাড়ি টেকনাফের শামলাপুর ও মীনাবাজার এলাকায়। এর আগে প্রথম দফায় তিন দিনে (২৩-২৫ আগস্ট) আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন মামলার বাদী ও সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস ও ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ও ২ নম্বর সাক্ষী সাহেদুল ইসলাম সিফাত।

২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে তিনটি (টেকনাফে দুটি, রামুতে একটি) মামলা করে। ঘটনার পাঁচ দিন পর অর্থাৎ ৫ আগস্ট কক্সবাজার আদালতে টেকনাফ থানার বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ৯ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। চারটি মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় র‍্যাব।

২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ওসি প্রদীপ কুমার দাসসহ ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও র‍্যাব-১৫ কক্সবাজারের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. খাইরুল ইসলাম।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন