default-image

গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে পিঠা তৈরির ধুম। হাঁড়িতে রান্না হয় হাঁসের মাংস। এই পিঠা, পায়েস, হাঁসের মাংস রান্নার আয়োজন দাওয়াত দিয়ে আনা জামাইদের জন্য। প্রতিবছর নবান্নে জামাইরা আসেন শ্বশুরবাড়িতে। পিঠা খাওয়ার আনন্দের সঙ্গে যোগ হয় গ্রামীণ সব খেলাধুলা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দুই দিনব্যাপী গ্রামে চলে মেলা।

দিনাজপুর শহর থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে বিরল উপজেলার মখলেসপুর গ্রামের জয়হার পাড়ায় ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে ঐতিহ্যবাহী এই মেলার আয়োজন করা হচ্ছে, যা পরিচিতি পেয়েছে জামাই মেলা হিসেবে।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে জয়পাড়া মেলা ঘুরে দেখা যায়, পুরো গ্রাম যেন উৎসবে মেতেছে। করোনা পরিস্থিতি মাথায় রেখে আয়োজকেরা মাইকে ঘোষণা করছেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা। গ্রামের মাঝখানে ধান মাড়াইয়ের মাঠ। মাঠের পশ্চিমে প্যান্ডেল তৈরি করে করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পূর্ব প্রান্তে চলে বিভিন্ন গ্রামীণ খেলা।

বিজ্ঞাপন

মেলায় আসা বিভিন্ন বয়সী মানুষ এসব খেলায় অংশ নেন। এর মধ্যে ছিল জামাইদের বস্তা দৌড়, বেলুন ফোটানো ও ধীরে সাইকেল চালানো। আরও ছিল রশি টানা, হাঁড়ি ভাঙা, নারীদের চেয়ার বদল, দুর্ভাগ্য বল, তরুণদের অংশগ্রহণে মোরগ যুদ্ধ ও যেমন খুশি তেমন সাজো।

খেলা পরিচালনা করেন মখলেসপুর গ্রামেরই অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আবদুর রাজ্জাক (৬৩)। তিনি বলেন, তাঁর বয়স হয়েছে। কিন্তু মেলার দিন এলে আনন্দে শরীরে জোশ চলে আসে। সকাল থেকে অন্তত ২০টি খেলা পরিচালনা করেন তিনি।

ঢাকার আশুলিয়া থানায় কর্মরত পুলিশ সদস্য তোফায়েল ইসলামের শ্বশুরবাড়ি এই গ্রামে। মেলা উপলক্ষে গ্রামে এসেছিলেন তিনি। আলাপকালে বলেন, গত বৃহস্পতিবার নাটোর থেকে স্ত্রী, ছেলেমেয়েদের নিয়ে শ্বশুরবাড়ি আসেন। ১০ বছরের দাম্পত্য জীবনের প্রতিবছরই এই মেলায় আসেন তিনি।

মখলেসপুর ছাড়াও আশপাশের গ্রামগুলো থেকেও পরিবার নিয়ে মেলায় এসেছিলেন অনেকে। মেলা প্রাঙ্গণের পাশাপাশি আশপাশের রাস্তা, বাড়ির উঠানে বসে জিলাপি, নিমকি, চটপটি, মুড়কিসহ নানা পদের খাবারের দোকান। নারীদের ভিড় ছিল চুড়ি-ফিতার দোকানের সামনে। আর শিশুদের পাশাপাশি অভিভাবকেরাও ওঠেন নাগরদোলা আর চরকিতে।

মেলায় শিশুদের হাতে বিভিন্ন নকশায় রঙের ছাপ দিতে দেখা যায় আমজাদ আলী (৫৫) নামের একজনকে। তিনি বলেন, ২০ বছরের বেশি সময় ধরে এই মেলায় আসেন তিনি। আগে জিলাপির দোকান ছিল তাঁর। এখন পুঁজি না থাকায় এই কাজ করেন।

স্থানীয় প্রবীণদের কাছে থেকে জানা যায়, শত বছর আগে মখলেসপুর গ্রামের প্রভাবশালী দুই ভাই ইসহাক শাহ ও ইউসুফ শাহ নতুন ধানের পিঠা খাওয়ার জন্য এলাকার জামাইদের আমন্ত্রণ জানিয়ে এই মেলার আয়োজন করেছিলেন। তাঁদের মৃত্যুর পর ইসহাক শাহের ছেলে শাহজাহান শাহ মেলা পরিচালনা করেন। বছর তিনেক আগে তিনিও মারা যান। বর্তমানে জামাই মেলার আয়োজন করছেন তাঁর মেয়ে সিফাত-ই-জাহান। মেলার নামকরণ হয়েছে শাহজাহান শাহ জামাই মেলা।

সিফাত-ই-জাহান বলেন, মেলা উপলক্ষে কয়েক দিন ধরে চলতে থাকে প্রস্তুতি। গ্রামের জামাইরা দূরদূরান্ত থেকে এসে মেলায় অংশ নেন। প্রতিবছর এমন আয়োজন হওয়ায় মানুষের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কও বেশ মজবুত।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন