বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সরেজমিন আজ শুক্রবার বেলা একটার দিকে দেখা যায়, বাংলাবাজার ঘাটে ফেরি বন্ধ থাকায় মোটরসাইকেলের আরোহীরা এই ঘাটে না এসে তাঁরা চলে যাচ্ছেন ৫০০ মিটার দূরে পুরোনো কাঁঠালবাড়ি ঘাটে। এই কাঁঠালবাড়ি ঘাটেই রাখা সারি সারি ট্রলার। আধা ঘণ্টা পরপর শিমুলিয়া থেকে ছেড়ে আসা যাত্রী ও মোটরসাইকেলবোঝাই করা ট্রলার কাঁঠালবাড়ি ঘাটে এসে ভিড়ছে। কাঁঠালবাড়ি ট্রলারঘাট থেকেও আধ-এক ঘণ্টা পরপর শিমুলিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারগুলো। প্রতিটি ট্রলারে ২৫ থেকে ৩০টি মোটরসাইকেল বহন করা হয়। একই সঙ্গে প্রায় শতাধিক যাত্রীও থাকে ট্রলারে। দিনের বেলায় প্রতি ট্রলারে একটি মোটরসাইকেল পারাপারের জন্য ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। রাতে নেওয়া হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা।

বাংলাবাজার ঘাটে ফেরি বন্ধ থাকায় মোটরসাইকেলের আরোহীরা এই ঘাটে না এসে তাঁরা চলে যাচ্ছেন ৫০০ মিটার দূরে পুরোনো কাঁঠালবাড়ি ঘাটে। এই কাঁঠালবাড়ি ঘাটেই রাখা সারি সারি ট্রলার।

শিমুলিয়া থেকে ট্রলারে আসা মোটরসাইকেলচালক মিঠু বলেন, ‘আমি জরুরি কাজে খুলনা যাব। তাই এই পথে বাইক নিয়ে আসছি। ফেরি না পেয়ে বাধ্য হয়েই ৫০০ টাকা দিয়ে ট্রলারে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হয়েছি। এ ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না।’ সিলেট থেকে বরিশাল মোটরসাইকেলযোগে যাচ্ছিলেন রফিকুল ইসলাম। ট্রলার থেকে নেমে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফেরি বন্ধ, সাঁতরে তো আর পদ্মা পার হওয়া যাবে না। তাই ঝুঁকি, ভয় নিয়েই আসতে হলো।’

মাদারীপুরগামী সাইদুল কবির নামের এক যাত্রী বলেন, ‘ঢাকা থেকে গাড়ি নিয়ে শিমুলিয়া ঘাটে এসে দেখি ফেরি বন্ধ। তাই বাধ্য হয়ে ট্রলারে পার হইছি। জরুরি না হলে এভাবে আসতাম না। তা ছাড়া আমার মতো অনেকেই এই ঝুঁকি নিয়ে আসতেছে। কেউ তো তাদের থামাচ্ছে না।’

স্থানীয় সূত্র জানায়, নৌপথে ট্রলারে যাত্রী ও মোটরসাইকেল পারাপারের নেপথ্যে রয়েছেন শিবচর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ও কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি বি এম আতাউর রহমান ওরফে আতাহার এবং ট্রলারঘাটের ইজারাদার সজীব হাওলাদার। ট্রলারঘাটে মালিকপক্ষ থেকে শ্রমিক—সবাই এই দুই নেতার কথামতো ট্রলার ঘাট থেকে ছাড়েন। এই ট্রলারঘাটেও সুপারভাইজার রয়েছে। শিফট অনুযায়ী রাসেল মল্লিক ও আক্তার মুনশি নামের এই দুজন এই ঘাট নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকেন। প্রতি ট্রলার ঘাটে আসা ও ছেড়ে যাওয়া মাত্রই তাঁদের দুই থেকে তিন হাজার টাকা কমিশনও দিতে হয়। কমিশনের একটি ভাগ ট্রাফিক পুলিশ ও নৌ পুলিশকে দিতে হয় বলে জানান ট্রলারমালিকেরা।

বড় একটি ট্রলারের শ্রমিক সাইদুল মাদবর বলেন, ‘ট্রলার বুইঝা মোটরসাইকেল লোড দেওয়া হয়। কোনোটায় ২০টা, আবার কোনোটায় ৩০টা। পুলিশসহ ঘাটে যারা আছে, তাদের ম্যানেজ করে ঘাটমালিকেরা। তা ছাড়া আমরা এখানে সবাই ভাইস চেয়ারম্যানের লোক। আমাদের যেভাবে চালাতে বলে, আমরা সেভাবেই ট্রলার চালাই।’

default-image

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক ট্রলারমালিক বলেন, ‘ঝুঁকি থাকলেও একটি ট্রলারে ৩০টি মোটরসাইকেল সুন্দরভাবে বহন করতে পারে। ৩০টি মোটরসাইকেলে ট্রলারে কমপক্ষে ১৫ হাজার টাকা ওঠে। তিন হাজার টাকা তেল খরচ যায়। এ ছাড়াই লাইনম্যান, ঘাটের সুপারভাইজার, ট্রাফিক পুলিশ, নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ডদেরও টাকা দিতে হয়। সব মিলিয়ে ট্রলার মালিক এক টিপে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পায়। বাকি টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়ে যায়।’

তবে যোগাযোগ করা হলে অভিযোগ অস্বীকার করেন শিবচর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান বি এম আতাউর রহমান। মুঠোফোনে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘ট্রলারঘাটের ইজারাদার সজীব হাওলাদারের নেতৃত্বে এসব ট্রলার চালানো হচ্ছে। ওরা আমার কথা বলে থাকলে মিথ্যা বলেছে। আমি এসবের সঙ্গে জড়িত নই।’

জানতে চাইলে কাঁঠালবাড়ি ট্রলারঘাটের ইজারাদার সজীব হাওলাদার বলেন, ‘কিছু ট্রলার লুকিয়ে লুকিয়ে মানুষ ও মোটরসাইকেল পারাপার করে, যা আমি জানিও না। আমি ঘাটে লোক পাঠিয়ে বিষয়টি দেখছি।’

কাঁঠালবাড়ির ট্রলারঘাটটির পাশেই ট্রাফিক পুলিশের কার্যালয়। পুলিশের চোখের সামনে ট্রলারে যাত্রী ও মোটরসাইকেল পারাপারের বিষয় জানতে চাইলে ঘাটের দায়িত্বরত পুলিশ পরিদর্শক জামালউদ্দিন বলেন, ‘ট্রলারগুলোয় যাত্রী ও মোটরসাইকেল পার হওয়ার বিষয় আমরা জানি না। এগুলো নৌ পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করে।’

জানতে চাইলে ঘাটে দায়িত্বরত চরজানাজাত নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক আবদুল রাজ্জাক মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশের চোখের সামনে ট্রলারঘাট। তারা এমন অনেক কিছুই দেখেও দেখে না। আমাদের লোকবল কম। নেই জলযানও। তাই এসব ট্রলার বন্ধে আমরা সেভাবে কাজ করতে পারছি না।’

স্থানীয় লোকজন জানান, নৌ পুলিশ, ঘাট কর্তৃপক্ষের চোখের সামনেই ট্রলার চলাচল করছে। এসব বন্ধে মাঝেমধ্যে নৌ পুলিশের অভিযান দিলেও পরে আবার ট্রলারগুলো ছেড়ে দিচ্ছে। ফলে কোনোভাবেই ট্রলারে যাত্রী ও মোটরসাইকেল পরিবহন বন্ধ হচ্ছে না।

বিআইডব্লিউটিএ বাংলাবাজার ঘাটের ট্রাফিক পরিদর্শক আক্তার হোসেন বলেন, ‘ট্রলার ঘাটের ইজারা থাকলেও যাত্রী ও মোটরসাইকেল পারাপার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব বন্ধের জন্য আমরা পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অফিশিয়াল চিঠি দিয়েছি। তারা কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় অবৈধ এসব ট্রলার চলাচল ঠেকানো যাচ্ছে না।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন