সাবাড় ১০০ টিলা

সিলেট জেলায় কতগুলো টিলা ছিল, এখন কতগুলো আছে, এর সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে বেলা সিলেটের সমন্বয়ক শাহ সাহেদা জানান, ১৯৫৬ সালে ভূমির মাঠ জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের ৬ উপজেলায় ১ হাজার ২৫টি টিলার অস্তিত্ব তাঁরা পেয়েছেন। এর বাইরে আরও তিনটি উপজেলায় বেশ কিছু টিলা আছে। এসবের মধ্যে অন্তত ১০০ টিলা পুরোপুরি কিংবা আংশিক সাবাড় হয়ে গেছে।

বেলার তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ২৫টি টিলার মধ্যে নগর ও উপকণ্ঠের এলাকা মিলিয়ে সিলেট সদর উপজেলায় টিলা রয়েছে ১৯৯টি। এর বাইরে গোলাপগঞ্জে ৪১৩টি, বিয়ানীবাজারে ২৭০টি, জৈন্তাপুরে ৯৮টি, গোয়াইনঘাটে ৪৪টি ও কোম্পানীগঞ্জে একটি টিলা আছে। এর বাইরে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় ২৫১ দশমিক ৮ একর টিলাশ্রেণির ভূমি আছে। এ ছাড়া দক্ষিণ সুরমা ও কানাইঘাট উপজেলায়ও কিছু টিলা আছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ৬ (খ) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারি বা আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করতে পারবে না। তবে অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে পাহাড় বা টিলা কাটা যেতে পারে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জানায়, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি প্রভাবশালী ব্যক্তি, আবাসন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে টিলা কাটার বিস্তর অভিযোগ আছে। বাপা সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম চৌধুরী বলেন, গত তিন দশকে নগর ও আশপাশের ৫০ ভাগ টিলা কেটে সাবাড় করা হয়েছে।

টিলা কেটে বিমানবন্দর সম্প্রসারণ

সিলেটের এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণের (প্রথম পর্যায়) কাজ চলছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেইজিং আরবান কনস্ট্রাকশন গ্রুপ এ কাজের জন্য ২০২০ সালের ২৪ মার্চ কার্যাদেশ পেয়ে একই বছরের ১৯ এপ্রিল চুক্তি সম্পাদন করেছে।

স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ, বিমানবন্দরের ভেতরে পাঁচটি টিলা ছিল। সম্প্রসারণ কাজের শুরুতেই টিলা কাটা শুরু হয়। এরই মধ্যে তিনটি টিলা পুরোপুরি কেটে ফেলা হয়েছে। একটি টিলার অর্ধেক কেটে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। অপরটি এখনো অক্ষত আছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, বিমানবন্দরের ভেতরে যেখানে তিনটি টিলা ছিল বলে স্থানীয় ব্যক্তিরা অভিযোগ করেছেন, তা কেটে সমতল করে ফেলা হয়েছে। একটি এক্সকাভেটর দিয়ে আরেকটি টিলা কাটতে দেখা গেছে। এরই মধ্যে এ টিলার অর্ধেক কেটে ফেলা হয়েছে।

তবে টিলা কাটার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সম্প্রসারণ কাজের প্রকল্প পরিচালক শাহ জুলফিকার হায়দার। তিনি বলেন, বিমানবন্দরে যখন ১০ হাজার ফুট লম্বা রানওয়ে করা হয়েছিল, তখন মাটি কেটে এখানে রাখা হয়েছিল। এগুলো ছিল ঢিবির মতো। এসব ঢিবিই এখন সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এখানে যেসব টিলা ছিল, সেগুলো আগেই কেটে ফেলা হয়েছে, যখন প্রথম বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে স্থানীয় পঞ্চাশোর্ধ্ব দুই বাসিন্দা জানান, বিমানবন্দর সম্প্রসারণে ঢিবি নয়, টিলা কাটা হয়েছে এবং হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিমানবন্দর সম্প্রসারণে টিলা কাটা হচ্ছে কি না, জানা নেই। খোঁজ নিয়ে সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরেজমিনে অন্যান্য এলাকা

গত মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরের হাওলদারপাড়া এলাকায় ‘মজুমদার টিলা’র অনেকখানি কেটে সমতল করে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, রাতের আঁধারে এ টিলা কাটা হচ্ছে।

নগরের ব্রাহ্মণশাসন এবং শহরতলির বালুচর, পীরেরবাজার, খাদিমনগর ও গোয়াবাড়ি এলাকায় ছয়টি টিলা কাটা চলছে। এ ছাড়া সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ ও রানাপিং এবং জৈন্তাপুর উপজেলায় বেশ কয়েকটি টিলা কাটা হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এক্সকাভেটর দিয়ে টিলা কাটা হচ্ছে। ট্রাক বা ঠেলাগাড়ি দিয়ে টিলার মাটি সরানো হচ্ছে। টিলা কাটায় ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে বিভিন্ন এলাকা। নিঃশেষ হচ্ছে বনাঞ্চল।

স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, গত দেড় দশকে বেশি কিছু টিলা নিশ্চিহ্ন হয়েছে শহরের বালুচর ও আলুরতল এলাকায়। এখানে কয়েক বছরের ব্যবধানে টিলা কেটে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ছাত্র হল এবং দুটি টিলার আংশিক কেটে সরকারি ছাগল উন্নয়ন খামারের স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীন ইনস্টিটিউট অব লাইভস্টক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ভবন নির্মাণের জন্য তিনটি টিলা কাটা হয়েছে।

কী বলছে পরিবেশ অধিদপ্তর

পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, ২০২০ সালের জুলাই থেকে চলতি মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত সিলেটে পাহাড় ও টিলা কাটার বিরুদ্ধে এনফোর্সমেন্ট উইং ৩১টি অভিযান চালিয়ে ৬৩টি মামলার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করেছে ১ কোটি ৬৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত ৯টি অভিযান চালিয়ে ১৪টি মামলা করেছে এবং টিলা কাটার দায়ে ১২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, টিলা কাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। ভবিষ্যতেও তা চলবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন