default-image

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় ইটভাটার মাটি বহনকারী ট্রাক্টরের চাপায় এক বাইসাইকেল আরোহীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেখানে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে। লাশ নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনিম লিংকন রক্তাক্ত জখম হয়েছেন।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে হাসাদহ ইউনিয়নের কাটাপোল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির নাম মঈদুল ইসলাম (৩৪)। তাঁর বাড়ি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার শংকরহুদা-বাথানগাছি গ্রামে। নিহতের সাত বছর বয়সী ছেলে রাসেলকে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে মঈদুল তাঁর ছেলেকে নিয়ে বাইসাইকেলে করে শ্বশুরবাড়ি জীবননগর উপজেলার নতুন চাকলা গ্রামে যাচ্ছিলেন। কাটাপোল দক্ষিণপাড়ায় ইটভাটার মাটিবাহী ট্রাক্টরের ধাক্কায় বাবা-ছেলে আহত হন। এর কিছুক্ষণ পরই মঈদুল মারা যান। পুলিশ আহত শিশু রাসেলকে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করায়।

লাশ নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনিম লিংকন রক্তাক্ত জখম হয়েছেন।

এ ঘটনার পরপর স্থানীয় জনতা মাটি-বালু কাটা ও মাটিবাহী ট্রাক্টর চলাচল বন্ধ এবং দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবিতে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন। বিক্ষোভ চলাকালে গ্রামবাসীদের মধ্যে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, ইউএনও মুনিম লিংকন ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে মাটি কাটার অনুমতি দিয়েছেন এবং সেই মাটি বহনকারী ট্রাক্টরের ধাক্কায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ লাশটি উদ্ধার করতে গেলে গ্রামবাসীরা সোজা জানিয়ে দেন, লাশটি নিতে হলে ইউএনওকে কাটাপোল গ্রামে আসতে হবে।

বিজ্ঞাপন

খবর পেয়ে ইউএনও মুনিম লিংকন গ্রামটিতে পৌঁছে বিক্ষুব্ধ জনতার রোষানলে পড়েন। অবস্থা বেগতিক বুঝতে পেরে তিনি সেখান থেকে দৌড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে গেলে উত্তেজিত জনতার নিক্ষিপ্ত ইটের আঘাতে মাথায় আঘাত পান। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি স্থানীয় জমির উদ্দিনের বাড়িতে আশ্রয় নেন। বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী ওই বাড়ি ঘেরাও করে ইউএনওকে অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং বাড়িতে ইটপাটকেল ছোড়েন।

অবৈধভাবে মাটি কাটার দায়ে যাঁকে ভ্রাম্যমাণ আদালত ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করেছিলেন, সেই আল আমিন গ্রামে ফিরে জানান, ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাঁকে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যে কারণে গ্রামবাসী বেশ ক্ষুব্ধ ছিলেন। তারপর এ দুর্ঘটনায় ক্ষোভ বেড়ে যায়। অথচ জরিমানার টাকা চালানের মাধ্যমে পরদিন সোনালী ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে।
মুনিম লিংকন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জীবননগর

জীবননগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাফিজুর রহমান ঘটনা জানার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে যান এবং পুলিশের সহযোগিতায় বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করে অবরুদ্ধ ইউএনওকে উদ্ধার করে তাঁর বাসভবনে নেন। জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক সেলিনা আখতার জানান, ইউএনও আশঙ্কামুক্ত।

এদিকে খবর পেয়ে চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবু তারেক এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) জাহাঙ্গীর আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

স্থানীয় লোকজন জানান, কাটাপোল গ্রামের শাখাওয়াত ও আল আমিনের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে মাঠের পর মাঠ টপ সয়েলসহ মাটি ও বালু তুলে জমজমাট ব্যবসা করে আসছেন। তাঁদের মাটি ও বালু বহনে গ্রামের রাস্তাটিতে দৈনিক ৫০ থেকে ৬০টি ট্রাক্টর চলাচল করে। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রতিকার চেয়ে গ্রামবাসী সম্প্রতি ইউএনও বরাবর আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইউএনও মুনিম লিংকন ৯ মার্চ গ্রামটিতে অভিযান পরিচালনা করে ২টি ট্রাক্টর আটক এবং আল আমিনকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। কিন্তু জরিমানা করার পরদিন থেকে আবারও বেপরোয়াভাবে বালু ও মাটি তোলা চলতে থাকে। সেই মাটিবাহী একটি ট্রাক্টরের চাপাতেই একজন নিহত হলেন।

ইউএনও মুনিম লিংকন প্রথম আলোকে বলেন, অবৈধভাবে মাটি কাটার দায়ে যাঁকে ভ্রাম্যমাণ আদালত ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করেছিলেন, সেই আল আমিন গ্রামে ফিরে জানান, ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাঁকে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যে কারণে গ্রামবাসী বেশ ক্ষুব্ধ ছিলেন। তারপর এ দুর্ঘটনায় ক্ষোভ বেড়ে যায়। অথচ জরিমানার টাকা চালানের মাধ্যমে পরদিন সোনালী ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে।
জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, মাটি ও বালুর ব্যবসায়ীদের মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘হত্যা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আমি দুটি মামলা করতে বলেছি। আসামিদের ধরতে পুলিশকে বলা হয়েছে।’

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন