default-image

টাকা নেই—এই অজুহাতে কাজ বন্ধ রেখেছিলেন ঠিকাদার। ‘দরদ’ দেখিয়ে ঠিকাদারকে অন্য প্রকল্প থেকে আট কোটি টাকা দিয়ে দেয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। আবার দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করতে ব্যাংকঋণ নিয়েছিল। কাজের বিলের চেক ব্যাংকে দেওয়ার কথা। কিন্তু তা না করে সরাসরি ২৫ কোটি টাকার চেক দিয়ে দেন দুই ঠিকাদারকে। এই অনিয়ম ধরা পড়ে চলতি বছরের জানুয়ারির শেষের দিকে। আর নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ায় দুর্ভোগে রয়েছেন নগরবাসী।

চট্টগ্রাম নগরের গুরুত্বপূর্ণ দুটি উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদারদের এ সুবিধা দিয়েছে সিটি করপোরেশন। টাকা নিয়ে মাঝপথে কাজ ফেলে চলে গেছেন ঠিকাদারেরা। প্রকল্প দুটি হচ্ছে পোর্ট কানেকটিং (পিসি) সড়কের উন্নয়ন এবং মহেশ খালের পাশে বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণ। প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১৯ কোটি টাকা। এখন বাধ্য হয়ে কার্যাদেশ বাতিল করেছে করপোরেশন।

জাপানের দাতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে পরিচালিত দুটি প্রকল্প নিয়ে এমন অবস্থা। এ ঘটনায় প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনের বিরুদ্ধে গত ৩১ জানুয়ারি বিভাগীয় মামলা হয়েছে। ঠিকাদারদের দিয়ে দেওয়া এই ৩৩ কোটি টাকা কীভাবে আদায় করা হবে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। করপোরেশনের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ৩৩ কোটি টাকার দায় এখন সিটি করপোরেশনের।

কোনো ধরনের অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না বলে জানান সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী। সম্প্রতি মেয়রের কার্যালয়ে
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নিয়ম না মেনে ব্যাংকের পরিবর্তে সরাসরি ঠিকাদারের নামে চেক ইস্যু করার বিষয়টি তিনি অবগত আছেন। তবে অগ্রিম টাকা দেওয়ার বিষয়টি জানা নেই।

বিজ্ঞাপন

ব্যাংকের চেক ঠিকাদারের হাতে

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সারা দেশে পণ্য পরিবহনের কারণে নগরের লাইফলাইন বলা হয় পোর্ট কানেকটিং (পিসি) রোডকে। ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের দুটি অংশের কাজ পেয়েছিল মেসার্স রানা বিল্ডার্স এবং মেসার্স রানা বিল্ডার্স-ছালেহ আহম্মদ নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্প কাজের যাবতীয় কাজ করত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ছালেহ আহম্মদ’। এই প্রতিষ্ঠানের মালিক কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পীরযাত্রাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন।

এই কাজের জন্য ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের কুমিল্লা শাখা থেকে ঋণ নেয় দুটি প্রতিষ্ঠান। সিটি করপোরেশনের সম্মতির ভিত্তিতে এই ঋণ দেওয়া হয়। এতে শর্ত ছিল প্রতিষ্ঠান দুটির প্রাপ্য টাকার চেক ঠিকাদারদের পরিবর্তে ব্যাংকের প্রতিনিধিকে দেওয়ার। শর্তের বিষয়টি ২০১৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সিটি করপোরেশনের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা লিখিতভাবে ইউসিবিএলের এফভিপি ও হেড অব ব্রাঞ্চকে জানান। কিন্তু সিটি করপোরেশন নিজেই এই শর্ত ভঙ্গ করে ২৫ কোটি টাকার ১৪টি চেক সরাসরি ঠিকাদারকে তুলে দিয়েছে। এসব চেক দেওয়া হয় ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের জুন মাসের মধ্যে। ওই সময় সিটি মেয়র ছিলেন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন।

যোগাযোগ করা হলে ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মুঠোফোনে জানান, চেকগুলোর বিষয়ে সিটি করপোরেশনের হিসাব ও প্রকৌশল বিভাগকে গত মার্চ মাসে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে নেওয়া চেক ঠিকাদার ব্যাংকে জমা দেননি। এদিকে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ঠিকাদারদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জাকির হোসেনের মুঠোফোনে কল করে ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

সিটি করপোরেশনের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, সিটি করপোরেশনের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে ঠিকাদারদের সরাসরি চেক দেওয়া হয়। প্রকৌশল বিভাগও সুপারিশ করেছে। তিনি নির্দেশ মানতে বাধ্য হয়েছেন।

জানতে চাইলে আ জ ম নাছির উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এই জন্য সড়কের নির্মাণকাজ শেষ করার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি চেক দেওয়া হয়েছে। এখন ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা কীভাবে আদায় করা হবে, তা ব্যাংকের বিষয় বলে মন্তব্য করেন সাবেক মেয়র।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, নিয়মিত টাকা দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠান দুটি কাজের ব্যাপারে ছিল দায়সারা। নগরের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের কাজ শেষ করতে অন্তত তিন দফা সময় বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি মাত্র ৬০ শতাংশ। ২০১৯ সালের মে মাসে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়। এ ব্যাপারে ঠিকাদারদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কাজ জাইকার, টাকা দিল চসিক

চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ, হালিশহর, গোসাইলডাঙ্গাসহ বিশাল এলাকাজুড়ে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ মহেশখাল। গুরুত্বপূর্ণ এই খালের দুই পাশে বাঁধ ও সড়ক নির্মাণে ৪১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়।

জাইকার অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের কাজ শেষ করতে ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এবং ব্রিজসমূহের উন্নয়নসহ আধুনিক যান-যন্ত্রপাতি সংগ্রহ ও সড়ক আলোকায়ন’ প্রকল্প থেকে ঠিকাদার মঈনুদ্দিন বাঁশীকে আট কোটি টাকা দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল অগ্রণী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় এই টাকা দেওয়া হয়। এভাবে এক প্রকল্পের টাকা অন্য প্রকল্পের ঠিকাদারদের অগ্রিম দেওয়ায় প্রশ্ন তুলেছে নিরীক্ষা অধিদপ্তর। অধিদপ্তর এই বিষয়ে জবাব দিতে বলেছে। এই টাকা করপোরেশনের তহবিলে এখনো জমা হয়নি বলে জানিয়েছেন হিসাবরক্ষণ বিভাগের এক কর্মকর্তা। তবে তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের দাবি, এক প্রকল্পের টাকা অন্য প্রকল্প থেকে দেওয়ার বিষয়টি তাঁর জানা নেই।

ঠিকাদার মঈনুদ্দিনকে এই কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর। সময় দেওয়া হয় ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ের পর পার হয়েছে আরও ২১ মাস। কিন্তু কাজের অগ্রগতি মাত্র ৭০ শতাংশ। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও ঠিকাদার মঈনুদ্দিনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এই দুটি ঘটনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সনাক-টিআইবির চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এসব অনিয়মের পেছনে রয়েছে ঠিকাদারদের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের একশ্রেণির কর্মকর্তাদের যোগসাজশ। এতে ওই কর্মকর্তারা আর্থিকভাবে লাভবান হন। নতুন মেয়রকে শক্তভাবে এসব অনিয়ম মোকাবিলা করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন