default-image

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাতে দেশের উপকূলে আঘাত হানে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর। ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষা পেতে সেদিন খুলনার মোংলা উপজেলার চিলা গ্রামের সেন্ট মেরিস গির্জাসংলগ্ন আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছিলেন শত শত মানুষ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা সাথী সরকার ও তাঁর স্বামী জর্জি সরকারও। সূর্যোদয়ের কিছু আগে সাথীর কোলজুড়ে আসে ফুটফুটে এক শিশু। ততক্ষণে ঝড়ের তেজ কিছুটা কমেছে। ধ্বংসলীলার মধ্যে নতুন জীবন। তাই ঘূর্ণিঝড়ের নামের সঙ্গে মিলিয়ে শিশুটির নাম রাখা হয় ‘সিডর সরকার’। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে সিডর মানেই ধ্বংসাত্মক এক সর্বনাশা নাম। তবে ছোট্ট শিশু সিডর যেন ধ্বংসের মধ্যেই বেঁচে থাকার এক আনন্দবার্তা।

সিডর–বিধ্বস্ত এলাকায় তখন ধ্বংসলীলার ছবি তুলছিলাম। তারিখটা ১৬ বা ১৭ নভেম্বর হবে, ঘূর্ণিঝড়–বিধ্বস্ত এলাকার শিশুদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছিল। সে সময়েই একজন জানালেন আশ্রয়কেন্দ্রে সিডরের জন্মের খবর। শুনেই তাঁর দাদার বাড়িতে গিয়ে পৌঁছালাম আমরা। প্রথমে কথা হলো সিডরের দাদি রিভা সরকারের সঙ্গে। এর মধ্যেই শিশুটিকে নিয়ে এলেন মা সাথী সরকার। ক্যামেরা হাতে ছবি তোলার সময় মা হেসে ওঠেন, তখন হঠাৎ হেসে ওঠে সেই নবজাতকও। ছবিটি মিস হলো না। পরে খুলনায় এসে ছবিটি ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা গেল। ২১ নভেম্বর মায়ের সঙ্গে ছোট্ট শিশুটির হাসিমুখের সেই ছবি প্রথম আলোর তৃতীয় পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়। ধ্বংসের মধ্যে প্রাণের প্রতীক হয়ে ওঠে যেন সেই ছবি। পরবর্তীকালে ২০০৮ সালের প্রথম আলো বর্ষপঞ্জিতে সেই ছবি স্থান পায়।

বিজ্ঞাপন

সিডর সরকারের সঙ্গে প্রথম আলোর সম্পর্কের সেই সূত্রপাত। ২০০৮ সালে প্রথম আলোর আর্থিক সহযোগিতায় সিডরের পরিবারের বিধ্বস্ত বসতঘরটি নতুন করে নির্মাণ করে দেওয়া হয়। দেওয়া হয় দুটি খাট, সিডরের পোশাক ও কিছু প্রয়োজনীয় প্রসাধনীও। সংসার চালানোর খরচ জোগাতে বাড়ির পাশে একটি মুদিদোকানও করে দেওয়া হয়। সিডরের দাদা রণজিত সরকার ও বাবা জর্জি মিলে ভালোভাবেই সংসার চালিয়ে আসছিলেন। দোকানের লাভের টাকায় আগের দেনা শোধ করে ভালোই চলছিল জর্জি সরকারের সংসার। কিন্তু এরপর ঘূর্ণিঝড় আইলার ছোবলে আবার দুমড়েমুচড়ে যায় পরিবারটির বসতঘর। পানিতে তলিয়ে যায় দোকান আর সব মালপত্র। দুমড়েমুচড়ে যাওয়া ঘরটি নতুন করে তৈরি করে দেয় একটি বেসরকারি সংস্থা। এ সময় দীর্ঘদিন ধরে রোগে ভুগে মারা যান রণজিত সরকার। তাঁর মৃত্যুর পর নগদ পুঁজির অভাবে দোকানটি আর চালু করতে পারেনি সিডরের পরিবার।

default-image

সিডরের বাবা জর্জি সরকার (৩৩) ও মা সাথী সরকার (২৮) কয়েক বছর আগে অভাবের তাড়নায় মোংলা ছেড়ে চলে আসেন ঢাকায় ও চট্টগ্রামে। অভাবের সংসারে জর্জি ও সাথীর সম্পর্কেরও অবনতি ঘটতে থাকে। বর্তমানে সাথী ঢাকায় একটি বাড়িতে কাজ করেন। আর জর্জি বেছে নিয়েছেন মৎস্যজীবীর জীবন। মাছ ধরতে যান সাগরে কিংবা সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরেন। সাথী জানিয়েছেন, স্বামীর সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়েছে।

default-image

আর সিডর এখন খুলনার দাকোপ উপজেলার হরিণটানা গ্রামে ‘হোম অব লাভ’ নামের একটি মিশনারি বোর্ডিং স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। হোমের দায়িত্বরত শিক্ষক মাইকেল হালদার জানান, সিডর লেখাপড়ায় খুব ভালো করছে, সবার মধ্যে সে খুবই জনপ্রিয়।

সিডর এবার ১২ পেরিয়ে ১৩ বছরে পা দেবে। ভিডিও কনফারেন্সে সিডরের কাছে জানতে চাই, মায়ের সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করে কি? হাসিমুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায়। অভিমানে গলা ধরে আসে। সিডর বলে, ‘মা তো অনেক দূরে কাজ করে, আসতে তো পারে না। বাবা সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরে কিংবা সাগরে যায় মাছ ধরতে। সে-ও আসতে পারে না।’ সিডরই জানাল, বড়দিন এলে দাদি রিভা সরকার তাকে দেখতে যান, তখন অনেক আদর করেন।

সিডরের ইচ্ছা, সে বড় হয়ে চিকিৎসক হবে। বলল, ‘অনেক বড় হলে...ডাক্তারি পাস করে গ্রামে আসব। সবার চিকিৎসা করব।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0