default-image

খুলনায় সরকারিভাবে একমাত্র কিডনি ডায়ালাইসিস যন্ত্র রয়েছে শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে। কিন্তু গত শনিবার থেকে সেটি বন্ধ। এতে বিপাকে পড়েছেন কিডনি রোগীরা। দূরদূরান্ত থেকে ডায়ালাইসিস করতে এসে বাঁচার অনিশ্চয়তা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন তাঁরা।

কিডনি ডায়ালাইসিস করা হয় নেফ্রোলজি বিভাগের আওতায়। ডায়ালাইসিস বন্ধ থাকার কারণ হিসেবে হাসপাতাল পরিচালককেই দুষছেন ওই বিভাগের চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা প্রথম আলোকে বলেন, আগে কোনো যন্ত্র নষ্ট

হলে তাৎক্ষণিক স্থানীয়ভাবে মিস্ত্রি লাগিয়ে তা ঠিক করা হতো। ফলে সর্বোচ্চ এক দিনের মধ্যেই আবার কাজ শুরু করা যেত। কিন্তু বর্তমান পরিচালক ওই দায়িত্ব না নিয়ে মেরামতের ব্যবস্থা করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি লিখেছেন। এ কারণে সময় বেশি লাগছে।

১২ জানুয়ারি ওই হাসপাতালে পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন মুন্সি মো. রেজা সেকেন্দার। এর আগে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ছিলেন তিনি। ২০২০ সালের মে মাসে যোগদান করার পর হাসপাতালের বিভিন্ন কাযক্রম নিয়ে চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

এ সম্পর্কে মুন্সি মো. রেজা সেকেন্দার প্রথম আলোকে বলেন, পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টের ট্যাংকিতে আয়রন জমে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়েছে। এ কারণে তা ঠিক করতে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ডায়ালাইসিসের সঙ্গে অনেকগুলো যন্ত্র ওতপ্রতোভাবে জড়িত। কোনো একটি যন্ত্র নষ্ট হয়ে গেলে পুরো প্রক্রিয়াটিই বন্ধ হয়ে যায়। কিডনি ডায়ালাইসিস করার সময় ওষুধের সঙ্গে প্রয়োজন হয় বিশুদ্ধ পানি। কিন্তু হঠাৎ পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টটি (ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) নষ্ট হয়ে গেছে। এ কারণে কিডনি ডায়ালাইসিস বন্ধ করতে হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ের একটি দল প্ল্যান্টটি দেখে গেছে। তাঁরা জানিয়েছেন, দু–এক দিনের মধ্যে তালিকাভুক্ত ঠিকাদার মেরামতকাজ শুরু করবেন। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আরও কয়েক দিন লাগবে।

গত সোমবার দুপুরের দিকে নেফ্রোলজি বিভাগের সামনে গিয়ে দেখা যায়, কিডনি ডায়ালাইসিস করতে আসা কয়েকজন রোগী তখনো বসে রয়েছেন। দূরদূরান্ত থেকে ডায়ালাইসিস করতে এসেছিলেন তাঁরা। বন্ধ থাকার খবর শুনে কী করবেন তা বুঝতে পারছেন না।

বিভাগের সামনে অসহায়ের মতো বসে ছিলেন আবদুল মান্নান হাওলাদার (৫৬)। বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার আমড়াতলা গ্রাম থেকে এসেছেন। ১১ বছর ধরে কিডনি ডায়ালাইসিস করছেন। আবু নাসের হাসপাতাল থেকে সেবা নিচ্ছেন প্রায় সাড়ে আট বছর। তিনি বলেন, ‘আজকেই (সোমবার) তারিখ নির্ধারণ করা ছিল। ডায়ালাইসিস করতে না পারার কারণে বমি বমি লাগছে। কাছে টাকাও নেই যে অন্য জায়গা থেকে ডায়ালাইসিস করে নেব। বাড়ি যাওয়ার সাহস পাচ্ছি না, তাই বসে আছি। এখন আল্লাহর ওপর ভরসা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।’

সেখানে ডায়ালাইসিস করতে এসেছেন বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার এক স্কুলশিক্ষক শহিদুল ইসলাম (৩৬)। দুই বছর ধরে কিডনি ডায়ালাইসিস করছেন তিনি। পাঁচ বছরের এক মেয়ে রয়েছে তাঁর। শহিদুল ইসলাম বলেন, মাসে আটবার ডায়ালাইসিস করতে হয়। বেসরকারি হাসপাতালে খরচ অনেক বেশি। সময়মতো ডায়ালাইসিস করাতে না পারলে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।

জানা গেছে, খুলনায় বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিবার কিডনি ডায়ালাইসিস করতে খরচ হয় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। তিনটি বেসরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করা হয়। অন্যদিকে আবু নাসের হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করতে খরচ হয় মাত্র ৪১৫ টাকা। এ কারণে গরীব রোগীদের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল সেটি। ওই হাসপাতাল থেকে প্রতিদিন ৭৫ থেকে ৮০ জন রোগীর কিডনি ডায়ালাইসিস করা হয়। খুলনা জেলাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীরা ডায়ালাইসিস করতে সেখানে আসেন।

হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক ইনামুল কবির বলেন, ডায়ালাইসিসের সঙ্গে মানুষের জীবন-মরণের সম্পর্ক। সঠিক সময়ে ডায়ালাইসিস করাতে না পারলে রোগী মারাও যেতে পারে। এ কারণে যদি বোঝা যায় কোনো যন্ত্র সমস্যা সৃষ্টি করছে, তাহলে আগ থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বেশ কয়েক দিন ধরে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টটি সমস্যা করছিল। ব্যাপারটি আগে থেকেই পরিচালককে জানানো হয়েছিল। কিন্তু সঠিক সময়ে পদক্ষেপ না নেওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে ডায়ালাইসিস। কবে নাগাদ শুরু করা যাবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তিনি।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন