বিজ্ঞাপন

গত বুধবার বিকেলে পাঁচগাঁওয়ের এই বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, বাড়িতে টালির ছাদের যে ঘর ছিল, তার চিহ্ন আর নেই। খালি ভিটা পড়ে আছে। লোহার খুঁটি, ইটের দেয়াল—সবকিছুই ভিটা থেকে হারিয়ে গেছে। সেখানে লাল রঙের ইট–সুরকির কিছু টুকরা ছড়ানো–ছিটানো। ভেজা মাটির বুকে কিছু লতাপাতার গাছ উঠেছে। পেঁপেগাছসহ কিছু বস্তায় লাগানো হয়েছে বিভিন্ন জাতের সবজির চারা। বোঝার উপায় নেই মাস কয়েক আগেও এ ভিটার ওপর ভাঙাচুরা হলেও একটি ঘরের কাঠামো দাঁড়িয়ে ছিল।

default-image

স্থানীয় সূত্র জানায়, লীলা নাগের পিতা গিরিশ চন্দ্র নাগের আমলে ঘরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ভিটার পশ্চিম অংশে একটি পাকা টিনের ঘর। যাঁরা এখন বাড়িটিতে বাস করছেন, সেটা তাঁদের। কিছুদিন আগে মৌসুমি ঝড়ে ভিটায় দাঁড়িয়ে থাকা ঘরটির অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এমনটাই জানা গেছে বাড়ির লোকজনের কাছ থেকে। ভিটার পাশেই শতবছরের পুরোনো কড়ইগাছটি বিশাল শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই গাছের কোথাও ডালে বসে অবিরাম ডেকে চলছে একটি ‘বউ কথা কও’ পাখি। নির্জন-নৈঃশব্দ্যে সেই ডাক ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামে।

লীলা নাগ গবেষক, লীলা নাগ স্মৃতি পরিষদ, বাড়ির বাসিন্দা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁওয়ে ছিল লীলা নাগের বাবার বাড়ি। তাঁর বাবা গিরিশ চন্দ্র নাগ আসামের গোয়ালপাড়া মহকুমার প্রশাসক ছিলেন। সেখানে ১৯০০ সালের ২ অক্টোবর লীলা নাগের জন্ম। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা কলকাতা ব্রাহ্ম স্কুলে, মাধ্যমিক ঢাকার ইডেন গার্লস স্কুলে। কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে বিএ (সম্মান) ইংরেজিতে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯২১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী। বিপ্লবী ও দার্শনিক অনিল রায়ের সঙ্গে ১৯৩৯ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

লীলা নাগ ইংরেজিতে এমএ পাস করে স্বদেশী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নারী সমাজকে রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিক্ষার মূল ধারায় টেনে আনতে বহুমুখী কর্মধারার সূচনা করেন তিনি। দীপালি সংঘ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন ধারার নারী আন্দোলনের দ্বার উন্মোচন করেন লীলা।

লীলা নাগ ইংরেজিতে এমএ পাস করে স্বদেশী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নারী সমাজকে রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিক্ষার মূল ধারায় টেনে আনতে বহুমুখী কর্মধারার সূচনা করেন তিনি। দীপালি সংঘ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন ধারার নারী আন্দোলনের দ্বার উন্মোচন করেন লীলা। যোগ দিয়েছিলেন গোপন বিপ্লবী দল শ্রীসংঘে, জাগরণ মন্ত্রে উদ্দীপ্ত করেছিলেন আরও অনেক তরুণীকে। নারীশিক্ষা মন্দির ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে স্ত্রীশিক্ষা প্রসারের জন্য কাজ করেন তিনি।

১৯৩৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া নামে জাগরণের বাণী বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে দিতে বের করেন ‘জয়শ্রী’ পত্রিকা। তাঁর পৈত্রিক ভিটার একাংশে মা কুঞ্জলতা দেবী চৌধুরীর নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বর্তমানে এটি কুঞ্জলতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৭০ সালের ১১ জুন লীলা নাগ মারা যান।

বাড়ির বর্তমান বাসিন্দা কুঞ্জলতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল মুনিম চৌধুরী ও তাঁর পরিবার। এই পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৫ সাল থেকে তাঁরা এ বাড়িতে বাস করছেন। আবদুল মুনিমের বাবা আলাউদ্দিন চৌধুরী বাড়িটি জেলা প্রশাসন থেকে ৪৫ বছরের জন্য ইজারা নিয়েছিলেন। এর আগে বাড়িটি ছিল ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়। এরপর আবারও ইজারার জন্য ২০১৫ সালে আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থায়ী ইজারার জন্য হাইকোর্টে একটি মামলাও করেছেন তিনি। এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আলাউদ্দিন চৌধুরী ২০১৩ সালে মারা গেছেন। বাড়িতে বর্তমানে একটি পুকুরসহ ১ একর ৬৫ শতক ভূমি আছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় লীলা নাগের বাড়ির লোকজন তখনকার পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমান।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে আবদুল মুনিম চৌধুরীকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। বাড়িতে তাঁর বৃদ্ধা মা শামসুন্নাহার চৌধুরী ছিলেন। তিনি (শামসুন্নাহার চৌধুরী) এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, লীলা নাগের পৈতৃক ভিটার ঘরটি কিছুদিন আগে ঝড়ে ভেঙে পড়েছে। ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে তাঁরা এ বাড়িতে আছেন। বাড়ি নিয়ে হাইকোর্টে একটি মামলা আছে।

‘লীলা নাগ ও বাংলার নারী জাগরণ’ গ্রন্থের লেখক ও গবেষক দীপংকর মোহান্ত গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘লীলা নাগ এ অঞ্চলের নারীশিক্ষার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। মা কুঞ্জলতার নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন লীলা নাগ। তাঁর বাবা গিরিশ চন্দ্র নাগের বহু জায়গা ছিল। তখনকার মৌলভীবাজার মহকুমায় প্রথম বিশুদ্ধ পানির জন্য বাড়িতে নলকূপ স্থাপন করেছিলেন গিরিশ চন্দ্র নাগ। নলকূপ স্থাপন করতে কলকাতা থেকে শ্রমিক নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর বাবার শ্রাদ্ধও হয়েছিল এ বাড়িতে। লীলা নাগ বহুবার এ বাড়িতে আসা–যাওয়া করেছেন। তাঁর পৈতৃক বাড়িটিকে সংরক্ষণ করা দরকার।’

লীলা নাগ স্মৃতি পরিষদের সভাপতি কবি ইন্দ্রজিৎ দেব গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘লীলা নাগকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করতে এই বাড়িকে সংরক্ষণ করা দরকার। বাড়িটিতে শিল্প-সংস্কৃতির একটি প্রতিষ্ঠান করা যেতে পারে। পাঠাগার করা যেতে পারে। একটি মিলনায়তন হলে নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চলতে পারে। এতে অঞ্চলটি শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে ধারণ করে অগ্রসর হতে পারে।’

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ বাড়িতে আমি গিয়েছি। উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কাগজপত্র নিয়ে বসেছিলাম। বাড়ি নিয়ে একটি মামলা আছে। লীলা নাগের মৃত্যুদিনকে সামনে রেখে কিছু একটা করার চিন্তা মাথায় ছিল। কিন্তু কোর্ট বন্ধ থাকাসহ বিভিন্ন কারণে সেইভাবে কাজ আগানো যায়নি। মামলা কী অবস্থায় আছে, তা জানতে কিছুদিনের মধ্যেই আরডিসি ঢাকায় যাবেন। মামলার অবস্থা দেখে বাড়িটি উদ্ধারের সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন