তাঁদের অন্য রকম ভালো লাগা

বিজ্ঞাপন
default-image

একের পর এক সন্দেভাজন করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে যাচ্ছেন তাঁরা। কিন্তু এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে নিজেরাই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন কি না, তা জানতে পরীক্ষা করাতে ভয় পাচ্ছিলেন। এই ভয় তাঁদের নিজের জন্য নয়। তাঁদের আশঙ্কা, তাঁরা যদি করোনা ‘পজিটিভ’ হন, তাহলে নমুনা সংগ্রহের আর কেউ থাকবে না। এতে উপজেলায় নমুনা সংগ্রহের কাজ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ঝুঁকির কথা চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত তাঁরা নমুনা পরীক্ষা করালেন। ফল আসে ‘নেগেটিভ’। হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন তাঁরা। কারণ, নমুনা সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যেতে কোনো বাধা নেই। তাঁরা বললেন, দেশের এই ঘোর দুর্দিনে মানবসেবা করছেন, এর মধ্যে আছে অন্য রকম ভালো লাগা।

এই দুই করোনাযোদ্ধা হলেন সুষমা বালা মল্লিক (৫৩) ও প্রশান্ত কুমার ঘোষ (৩৮)। তাঁরা নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত। সুষমা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) আর প্রশান্ত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই)। গতকাল শনিবার পর্যন্ত তাঁরা ১৯১ জন সন্দেভাজন করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে নয়জন ছিলেন ‘পজিটিভ’। ‘পজিটিভ’ রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করেছেন তিনবার করে। উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁরাই নমুনা সংগ্রহ করেন। পর্যায়ক্রমে সঙ্গে থাকেন একজন চিকিৎসক।

গত ৮ এপ্রিল প্রথম তাঁরা নমুনা সংগ্রহ করেন ঢাকা থেকে আসা এক ব্যক্তির বাড়ি গিয়ে। তিনি করোনা ‘নেগেটিভ’ ছিলেন। পরদিন হাসপাতালে সংগ্রহ করেন নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা এক যুবকের নমুনা। তাঁর পরীক্ষার ফল আসে ‘পজিটিভ’। এভাবে একের পর এক নমুনা সংগ্রহের কাজ করে যাচ্ছেন তাঁরা।

কথা হয় এই দুই করোনাযোদ্ধার সঙ্গে। জানালেন, প্রথম থেকেই করোনা নিয়ে তাঁদের মধ্যে কোনো আতঙ্ক কাজ করেনি। তবে পরিবারের সুরক্ষার জন্য নিজেরা বাড়িতে থাকছেন আলাদা কক্ষে। সুষমা বাড়িতে ঢুকেই বাড়ির উঠানের নলকূপে গোসল করে ও কাপড় ধুয়ে নিজের কক্ষে চলে যান। প্রশান্ত ছাদে গিয়ে গোসল করে ও কাপড় ধুয়ে নিজের কক্ষে ঢুকেছেন। দুজনকেই দরজার সামনে খাবার দিয়ে যাচ্ছেন পরিবারের লোকজন।

প্রশান্তের ছয় ও চার বছর বয়সী দুটি ছেলে–মেয়ে। তিনি বললেন, প্রায় দেড় মাস ধরে সন্তানেরা তাঁর কাছ থেকে দূরে। তারা কাছে আসতে অনেক কান্নাকাটি করে, কাকুতি-মিনতি করে। এতে মাঝেমধ্যে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তবে নিজেকে সামলে নিচ্ছেন।

>

সুষমা বালা মল্লিক ও প্রশান্ত কুমার ঘোষ লোহাগড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত
১৯১ জনের নমুনা সংগ্রহ করেছেন তাঁরা

তাঁরা কাজ করছেন দেশের জন্য, সমাজের জন্য। কিন্তু সমাজের কারও কারও আচরণে মনে কিছুটা কষ্টও পেয়েছেন। নিজের বাড়ি ছেড়ে হাসপাতালে থাকতে অনুরোধ করেছেন আশপাশের কেউ কেউ।

প্রশান্ত বলছিলেন, ‘সবকিছু ছাপিয়ে নিজের মধ্যে প্রশান্তি কাজ করছে। কাজটি নিজের ও পরিবারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলেও মানবসেবা করতে পারছি, এর মধ্যে আছে অন্য রকম ভালো লাগা।’

প্রশান্তের স্ত্রী পপি রানী কর্মকার স্কুলশিক্ষক। তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের সাময়িক সমস্যা হলেও এ জন্য আমি গর্বিত। তাঁকে উৎসাহ জুগিয়েছি।’

সুষমা বালা মল্লিক জানান, তাঁর স্বামী স্বাস্থ্য বিভাগে চাকরি করেন। দুই ছেলেমেয়ে কলেজে ও স্কুলে পড়ে। তাঁরা ভালোভাবেই নিয়েছেন কাজটিকে। কিন্তু বাড়ির পাশের রাস্তায় হাঁটতে বের হলে এলাকার লোকজন বাধা দিয়েছেন। তাই ঘরেই হাঁটার কাজটি সেরে নিচ্ছেন তিনি। এ জন্য এলাকার মানুষের প্রতি খেদ নেই। কারণ সবার মধ্যে তো আতঙ্ক কাজ করছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শরীফ সাহাবুর রহমান বলেন, ‘আমার আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁরা এ কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা সময়ের সাহসী যোদ্ধা।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন