বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দিনভর একই সুরে কথা বলেছেন বোয়ালখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল করিমও। তাঁরা এসবের ‘কিছু জানেন না, কিছু দেখেননি।’ তাঁদের বক্তব্য নির্মলেন্দু গুণের ‘হুলিয়া’ কবিতার শেষ দুটি লাইনের মতো, ‘আমি এসবের কিছুই জানি না, আমি এসবের কিছুই বুঝি না।’

তাহলে শান্তিপূর্ণের নমুনাটা একবার দেখে আসি। সকাল সোয়া ৯টা। আহলা করলডাঙা ইউনিয়নের আছাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। ওই ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা হামিদুল হক চট্ট মেট্রো চ ১১-৩৪৯৬ নম্বরের একটি মাইক্রোবাসে কেন্দ্রটিতে আসেন। মাইক্রোবাসের কাচে মো. মোহরম আলী ও হামিদুল হকের পোস্টার ও স্টিকার লাগানো। তাঁরা দুই ভাই। দুজনেই চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে মোহরম আলী ‘ডামি প্রার্থী’ হিসেবে এলাকায় প্রচার ছিলেন। হামিদুল যখন আছাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আসেন, তখন আহত হয়ে হাসপাতালে মোহরম। দক্ষিণ করলডাঙা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট শুরুর আগের মারামরিতে আহত হয়েছিলেন তিনি।

ওই মারামারির প্রায় দুই ঘণ্টা পর হামিদুল হক মাইক্রোবাসযোগে আছাদিয়া স্কুল কেন্দ্রে নামেন। কিছুক্ষণ পর নৌকা প্রতীকের লোকজন গাড়িটির পেছনের কাচ ভেঙে দেন। হামিদুল হকের দিকে তেড়ে যান। এই চেয়ারম্যান প্রার্থীর পিছু পিছু একই কেন্দ্রের বাইরে উপস্থিত হয়েছিলেন সাংবাদিকেরাও। হামিদুল হকের লোক আখ্যা দিয়ে তাঁদের সাতটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এ সময় দু–একজনকে হেনস্তাও করা হয়।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন পুলিশের চান্দগাঁও সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মামনুন আহমেদ। তিনিও হেনস্তার শিকার হন। পরে তিনি ঘটনাস্থল থেকে মো. আমির ও মোস্তাকিম নামের দুজনকে আটক করেন। তবে মামনুন নির্বাচন কর্মকর্তা ও পুলিশ কর্মকর্তার পথে হাঁটেননি। মামনুন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘গণমাধ্যমের বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। দুজনকে আটক করেছি।’

default-image

সকাল ১০টা ২৬ মিনিটে বোয়ালখালী থানার ওসি আবদুল করিমের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এ সময় তিনি বোয়ালখালীর সাতটি ইউপিতে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হচ্ছে বলে দাবি করেন। করলডাঙায় ভোটের আগে ‘সামান্য ঘটনা ঘটলেও’ তখন পরিস্থিতি শান্ত বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষায়, সেখানে দুজন সামান্য আহত হয়েছেন।

বেলা ১১টায় আছাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সরেজমিনে দেখা যায়, বাইরে নারী পুলিশের সারি। ভেতরে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মেহেদী হাসানের কক্ষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মামনুন আহমেদ বসে আছেন। তখন ম্যাজিস্ট্রেটের মুঠোফোনে পাশের আরেকটি কেন্দ্রে ঝামেলা হওয়ার খবর আসে। প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ম্যাজিস্ট্রেটকে তাঁর কেন্দ্র ত্যাগ না করার অনুরোধ জানাতে থাকেন। ম্যাজিস্ট্রেট মামনুন আশ্বস্ত করেন, তিনি চলে গেলেও আরও একজন আসবেন।

তখন এই কেন্দ্রের তিনটি কক্ষের সবগুলোতে হামিদুল হকের আনারস প্রতীকের এজেন্ট ছিল না। খায়ের আহমদ নামের এক এজেন্ট বলেন, ‘আমাকে বের করে দিয়েছিল। এখন আবার এসেছি। বাকিদের কথা জানি না।’

পাশের আহ্লা জয়কালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বেলা সাড়ে ১১টায় দেখা যায়, আনারসের এজেন্ট সব কক্ষে নেই। বাইরে নৌকার ব্যাজ লাগানো লোকজনের ভিড়। বহিরাগতও আছেন। নগরের এক যুবলীগ নেতার অনুসারীদেরও দেখা গেছে এসব কেন্দ্রে। প্রিসাইডিং কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ভোট নির্বিঘ্ন হচ্ছে। তবে একটি পক্ষ ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। আমি ম্যাজিস্ট্রেটকে জানিয়েছি।’
সারোয়াতলী পিসি সেন উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে বেলা একটায় ফুটবল ও তালা প্রতীকের দুই ইউপি সদস্যের সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। লাঠিসোঁটা নিয়ে তাঁরা সংঘর্ষে জড়ান। পরে পুলিশ এসে ধাওয়া দেয়। এখানে চেয়ারম্যান পদে বর্তমান চেয়ারম্যান কাজল দের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির অনুপম বড়ুয়া।

default-image

আবার একটু করলডাঙা ইউনিয়নে ঘুরে আসি। এবার উত্তর ভূর্ষি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। তখন বেলা দেড়টা। ওখানেও আনারস প্রতীকের এজেন্ট সব কক্ষে দেখা যায়নি। কেন্দ্রের বাইরে ছিল নৌকা প্রতীকের লোকজনের দৌরাত্ম্য।
ওখান থেকে ফেরার সময় কানে আসে গোলাগুলির শব্দ। শব্দের দিকে এগোতে এগোতে দেখা যায়, আছাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে দুই পক্ষ হকিস্টিক, রামদা নিয়ে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় লিপ্ত। মাঝেমধ্যে গুলির শব্দ। ততক্ষণে লাইনে থাকা ভোটাররা পালিয়েছেন। কেন্দ্রের বাইরে বিজিবির সদস্যরা অবস্থান নেন।

বেলা আড়াইটার দিকে শাকপুরা আজগর আলী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন সোহেলের কর্মী মো. সুমনের মাথা ফাটিয়ে দেন নৌকার প্রার্থীর লোকজন। এখানে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুল মান্নান।
এর কিছুক্ষণ পর গিয়াস উদ্দিন বোয়ালখালী প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ৯টি কেন্দ্রের ৭টি দখল করে নিয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটকে ‘নৌকার সিল মারা’ পুরো বই দিয়েছেন। তবু নির্বাচন স্থগিত করেননি।
দিন শেষে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বললেন, ‘সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ’ ভোট হয়েছে। কোনো গোলযোগ, কেন্দ্র দখলের অভিযোগ কেউ তাঁর কাছে করেননি।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন