default-image

কেউবা বলেন হাওরের রাজধানী। রূপের রানিও বলেন কেউ কেউ। কবিরা বলেন জোছনার শহর। হাওর-বাঁওড় আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা নিজের মতো করে তুলে ধরতে সুনামগঞ্জের সুনাম এভাবেই লোকমুখে প্রচারিত হয়েছে। বর্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রকৃতিতে তখন তৃতীয় ঋতু শরৎ এক অপূর্ব শোভা ধারণ করে আবির্ভূত হয়েছে মাত্র। শরতেও পিছু ছাড়েনি বিদায়ী বর্ষার বৃষ্টি। তখনই একদিন যাদুকাটা নদ, শিমুলবাগান, বারিকের টিলা, শহীদ সিরাজউদ্দিন লেক হয়ে টেকেরঘাটের লাকমাছড়া দর্শনে বেরোই।

বৃষ্টির বাগড়ায় সুনামগঞ্জ শহর থেকে মোটরবাইকে করে ছুটছি অজানা লাকমাছড়ার কোলে। লাকমাছড়াটি পড়েছে তাহিরপুর উপজেলায়। ইতিহাস বলে, প্রাচীন শ্রীহট্টের তিন ভাগে ছিল জয়‌ন্তিয়া, গৌড় আর লাউড় রাজ্য। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ছিল ‘লাউড় রাজ্য’। রাজার রাজ্য নেই, তবে চিহ্ন পুরো এলাকাজুড়ে বিদ্যমান।

যাত্রার শুরু থেকেই পুরো পথের প্রাকৃতিক শোভা মনের কোণে জায়গা করে নেয়। পথের ধারে বুনো ফুল, প্রজাপতি আর ঘাসফড়িংয়ের ওড়াউড়ি। ওপারের পর্বতমালা আর এপারের যাদুকাটা নদের বিশালতা দেখতে দেখতে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে নিজের অবস্থান তখন কালো পাথরের বারেকটিলার ওপরে। সেখান দেখা হয় যাদুকাটা নদের বুকে পাথর-বালু-কয়লাশ্রমিকদের ব্যস্ততা।

বিরতির পর সড়কের পাশে উঁচু জমিতে আমন ধানের কাঁচা ঘ্রাণ, হাওরের স্বচ্ছ নীল জলে জেলেদের ব্যস্ততা দেখতে দেখতে চলে আসি সীমান্তবর্তী এলাকা টেকেরঘাটে। সেখানে পাহাড়-টিলায় মোড়ানো শহীদ সিরাজউদ্দিন লেক। লেকের পানি এতটাই স্বচ্ছ আর নীল, যেন কেউ নীল রং ঢেলে দিয়েছে লেকের জলে। টেকেরেঘাট বাংলাদেশের পরিত্যক্ত চুনাপাথর প্রকল্প। এখান থেকে ঠিক পাঁচ মিনিটের পথ ধরে যাই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য লাকমাছড়া।

বিজ্ঞাপন

মেঘালয় পর্বতমালার ভাঁজে ভাঁজে সবুজের আস্তর। সবুজ পাহাড়ের বুক বেয়ে নেমে এসেছে সরু ঝরনা। হিমশীতল স্বচ্ছ জলরাশি নিজ সুরে কলকল করছে। ছড়ার পানিতে দাপাদাপি করছে লাকমা গ্রামের দুরন্ত শিশু-কিশোর। ছড়ার বুকজুড়ে চুনাপাথর ছড়ানো। শরতের আকাশে শুভ্র মেঘের আলিঙ্গন। কখনো নীলের ছায়া। সুদূরে ঝুলন্ত ব্রিজ। লাকমাছড়ার ওপরে ভারতীয়রা যোগাযোগের জন্য এটি নির্মাণ করেছে। পাহাড়ি এ সেতুটিও দেখতে দারুণ। একদিকে এমন মনলোভা লাকমা, আরেক দিকে হাওরের বিশালতা। লাকমাছড়া পা রেখেই চোখে শোভা পায় এমন সুন্দরের ছটা। প্রথম দেখায় আমাদের সফরসঙ্গী একজন বলে উঠল, ‘বাহ, কী অদ্ভুত সুন্দর। এ যেন প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য। লাকমাছড়া যেন সাদা পাথর আর বিছনাকান্দির সখা।’

default-image

সিলেট অঞ্চলে পাহাড়ি ছোট ছোট নালা ‘ছড়া’ নামে পরিচিত। সীমান্তবর্তী মেঘালয় পাহাড়ের কোলে দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের গ্রামের নামটিও লাকমা গ্রাম। গ্রামটিও বেশ সুন্দর। গ্রামের পিঠেই রূপবতী লাকমাছড়ার অবস্থান। পুরো এলাকাটাই যেন পাথর। পাহাড় থেকে নেমে আসা ছড়ার পানি পাটলাই নদ হয়ে হাওরে গড়ায়। এখান থেকে মেঘালয় পাহাড় এতটাই কাছে যে হাত বাড়িয়ে পাহাড় ছোঁয়ার ইচ্ছা জাগে।

তবে এখনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি সেখানে। প্রাকৃতিক আবহেই নিজের রূপ মেলে ধরে আছে লাকমাছড়া। তার এমন মায়াবী রূপে যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমী মুগ্ধ হয়ে উঠবেন। সবুজময় এই পাহাড়ি ছড়া ও গ্রামটিকে দূর থেকে দেখতে চমৎকার লাগে। দেখতে সিলেটের বিছনাকান্দির মতো হলেও লাকমার কপালে তেমন পরিচিতি জোটেনি। প্রাকৃতিক বিন্যাস ঠিক রেখে ‘নীলাভ লাকমাছড়া’ হতে পারে সুনামগঞ্জের নতুন পর্যটনকেন্দ্র।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন