default-image

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় ২০১৭ সালে প্রশাসনের লোক পরিচয় দিয়ে তিন ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন সাদাপোশাক পরা কয়েকজন। এরপর কেটে গেছে ৪০ মাস। এই সময়ে তাঁরা কেউই ফিরে আসেননি। তাঁরা বেঁচে আছেন, নাকি মরে গেছেন, তা তাঁদের পরিবারের সদস্যরা জানে না। ওই তিনজন পরিবারের প্রধান ব্যক্তি ছিলেন। তাই আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় এবং ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে না পারায় তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।

নিখোঁজ থাকা তিন ব্যক্তি হলেন হামিরকুৎসা গ্রামের কৃষক আবদুল কুদ্দুস (৫৩), পলাশী গ্রামের মোরশেদ আলম (৪০) ও কাঁঠালবাড়ি গ্রামের গরু ব্যবসায়ী আবদুল কুদ্দুস (৩৮)। ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ থেকে ১৯ এপ্রিলের মধ্যে তাঁদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

নিখোঁজ থাকা তিন ব্যক্তি হলেন হামিরকুৎসা গ্রামের কৃষক আবদুল কুদ্দুস (৫৩), পলাশী গ্রামের মোরশেদ আলম (৪০) ও কাঁঠালবাড়ি গ্রামের গরু ব্যবসায়ী আবদুল কুদ্দুস (৩৮)। ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ থেকে ১৯ এপ্রিলের মধ্যে তাঁদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন

নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তিনজনের পরিবারের সদস্যরা ২০১৭ সালেই থানায় সাধারণ ডায়েরি  করেছিলেন। কিন্তু আজও পুলিশ তাঁদের উদ্ধারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার দাবি করেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর (প্রশাসনের লোক) পরিচয় দিয়ে তাঁদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে পুলিশের দাবি, দেশের সব থানায় তাঁদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে বেতারবার্তা পাঠানো হয়েছে। এর আগে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ, র‍্যাব ও পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথম আলোকে বলা হয়েছিল, তাদের কেউ ওই তিনজনকে তুলে নেয়নি। নিখোঁজ হওয়া এসব ব্যক্তি বেঁচে আছেন কি না, এ নিয়েও সংশয়ে রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ওই তিনজনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১৯ এপ্রিল বিকেলে উপজেলার পলাশী গ্রামের মোরশেদ আলম নামের এক ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই দিন রাজশাহীর আদালত থেকে একটি মামলার হাজিরা দিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন তিনি। উপজেলার তালতলি বাজারে পৌঁছালে তিনটি মোটরসাইকেলে করে আসা লোকজন তাঁর ভ্যানের গতি রোধ করেন। তাঁরা  প্রশাসনের লোক পরিচয় দিয়ে ভ্যান থেকে নামিয়ে তাঁকে তুলে নিয়ে যান। ওই বছরের ৬ এপ্রিল সকালে উপজেলার কাঁঠালবাড়ি গ্রামের গরু ব্যবসায়ী আবদুল কুদ্দুসকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওই দিন সকালে তিনি ভটভটিতে নওগাঁর আহসানগঞ্জ হাটে গরু কেনার জন্য যাচ্ছিলেন। বারুইহাটি এলাকায় পৌঁছালে দুটি মোটরসাইকেল ভটভটির গতি রোধ করে প্রশাসনের লোক পরিচয় দিয়ে তাঁকে তুলে নিয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন
নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিভিন্ন স্থানে খুঁজে না পেয়ে থানায় আলাদাভাবে জিডিকরা হয়েছে। জিডিতে চেহারার বর্ণনা, ওই সময়ে কী অবস্থায় ছিলেন—সেসবের বিবরণ দেওয়া হলেও তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। থানা-পুলিশের পরামর্শে এভাবে জিডি করা হয়েছে বলে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা বলেন, ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় দুটি মোটরসাইকেল নিয়ে চারজন সাদাপোশাক পরা লোক উপজেলার হামিরকুৎসা গ্রাম থেকে আবদুল কুদ্দুস (৫৩) নামের এক ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে যায়। মাঠ থেকে গরু নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তাঁরা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিভিন্ন স্থানে খুঁজে না পেয়ে থানায় আলাদাভাবে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। জিডিতে চেহারার বর্ণনা, ওই সময়ে কী অবস্থায় ছিলেন—সেসবের বিবরণ দেওয়া হলেও তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। থানা-পুলিশের পরামর্শে এভাবে জিডি করা হয়েছে বলে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।  

বিজ্ঞাপন

নিখোঁজ মোরশেদুল আলমের স্ত্রী সেলিনা বিবি বলেন, স্বামীই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তিনি এখন সাড়ে তিন বছর বয়সী সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন । স্বামী বেঁচে আছেন, না মরে গেছেন, সে বিষয়েও কিছু জানেন না। তিনি প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেও স্বামীর সন্ধান পাননি।
হামিরকুৎসা গ্রামের আবদুল কুদ্দুসের ছেলে জাহিদ হোসেন বলেন, বিভিন্ন স্থানে ও দপ্তরে সন্ধান করেও তিনি তাঁর বাবাকে না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন। বাবার নামে ব্যাংকের হিসাবে যে টাকা রয়েছে, তা-ও ওঠাতে পারছেন না। জমিজমা নিয়ে কিছু জটিলতা রয়েছে, তা-ও মেটাতে পারছেন না। কী কারণে কারা তাঁর বাবাকে নিয়ে গেল, সে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তিনি জানান, দেশের বাইরে পড়ার জন্য সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন। তবে তাঁর বাবা নিখোঁজ হওয়ার পর সে স্বপ্ন ভেঙে গেছে। বাড়িতে থেকে ছোট দুই বোনসহ পরিবারের সদস্যদের দেখভাল করছেন। প্রতিদিন নিখোঁজ বাবার জন্য তিনিসহ পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষা করেন।

বিজ্ঞাপন
ওই তিন ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। সম্প্রতি বিষয়টি জেলা পুলিশের নজরে এসেছে। এ ব্যাপারে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ইফতে খায়ের আলম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, রাজশাহী পুলিশ

কাঁঠালবাড়ি গ্রামের আবদুল কুদ্দুসের বোন ফেরদৌসি খাতুন বলেন, তাঁর ভাই উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর বৃদ্ধ বাবা পরিবারের হাল ধরেছিলেন। তিনিও ছয় মাস আগে মারা গেছেন। এখন চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে পরিবারটি চলছে। ভাইকে দ্রুত খুঁজে বের করে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় সূত্র জানায়,  ২০১৬, ২০১৮ ও  ২০১৯ সালে তুলে নেওয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার চার ইমাম, আওয়ামী লীগের এক নেতা ও ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে ফিরে এলেও ওই তিনজন এখনো ফেরেননি। ওই ছয় ব্যক্তিকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থান থেকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার ও কারাগারে পাওয়া যায়।
এই বিষয়ে রাজশাহী পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতে খায়ের আলম গতকাল সোমবার রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ওই তিন ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। সম্প্রতি বিষয়টি জেলা পুলিশের নজরে এসেছে। এ ব্যাপারে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মন্তব্য পড়ুন 0