default-image

লালমনিরহাটের পাটগ্রামে শিঙ্গিমারী নদীর ধার থেকে এক নারীর লাশ উদ্ধারের পাঁচ মাস পর হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানিয়েছে, পরকীয়া সম্পর্ক ধামাচাপা দিতে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার হামিদা আক্তার নারগিস ওরফে সুরমা (২৪) নামের ওই নারীকে পাটগ্রামে এনে হত্যা করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মূল আসামি শেরপুর জেলার ট্রাকচালক মো. জিরাব আলী (২৮), তাঁর ভাতিজা (১৫), লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সফিকুল ইসলাম (৫০) ও পাটগ্রাম উপজেলার শমসের আলী (৬০)।

আজ সোমবার বেলা সাড়ে তিনটায় পাটগ্রাম থানা কার্যালয়ে সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (বি-সার্কেল) তাপস সরকার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুমন কুমার মহন্ত হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন।

থানা–পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২ ডিসেম্বর সকালের দিকে উপজেলার জোংড়া ইউনিয়নের এন্তাজনগর (মোমিনপুর) গ্রামে লালমনিরহাট-বুড়িমারী স্থলবন্দর মহাসড়কের পাশে শিঙ্গিমারী নদী–সংলগ্ন স্থানে অজ্ঞাতনামা এক নারীর লাশ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে থেকে লাশ উদ্ধার করে। স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে লাশ শনাক্তের চেষ্টা চালায় পুলিশ। তবে স্থানীয় লোকজন জানান, নিহত ওই ব্যক্তি আশপাশের গ্রামের নয়। ফলে এটি একটি সূত্রহীন হত্যা মামলা হিসেবে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।

গত ১২ জানুয়ারি রংপুর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) উদ্ধার হওয়া লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। তারা জানতে পারে, হামিদা আক্তার (২৪) নামের ওই নারীর বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার ভরডোবা গ্রামের রফিকুল ইসলামের মেয়ে।

বিজ্ঞাপন

এই পরিচয়ের সূত্র ধরে পুলিশের একটি চৌকস দল দীর্ঘ তদন্তে ময়মনসিংহ, শেরপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে মূল আসামি শনাক্তসহ রহস্য উদঘাটন করে ও আসামিদের গ্রেপ্তার করে।

পুলিশ জানায়, হত্যার শিকার হামিদা আক্তারের স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছিল। প্রায় তিন বছর থেকে শেরপুর জেলার সদর উপজেলার ভাতশালা গ্রামের ট্রাকচালক জিরাব আলীর (২৮) সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর হামিদা জিরাব আলীকে বিয়ের জন্য চাপ দেন। বিয়ের দাবি তুলে জিরাবের বাড়ি গিয়েও অভিযোগ করেন তিনি। তবে দুই স্ত্রী ও একাধিক সন্তান থাকায় বিয়ে করতে রাজি না হয়ে পথ থেকে সরাতে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেন জিরাব।

পুলিশের তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩০ নভেম্বর ট্রাক নিয়ে ঢাকা থেকে বগুড়া হয়ে রংপুর আসার পথে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী মুঠোফোনের মাধ্যমে হামিদা আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন জিরাব। এরপর মাঝপথে হামিদাকে ট্রাকে তুলে নেন তিনি। সঙ্গে ভাতিজা হেলপারও (১৫) ছিল। ১ ডিসেম্বর রাত ১১টা থেকে ১২টার দিকে পাটগ্রাম উপজেলার লালমনিরহাট-বুড়িমারী স্থলবন্দর মহাসড়কের পাশে শিঙ্গিমারী নদীর ধারে ট্রাক দাঁড় করান। এরপর ট্রাকে থাকা বালিশ দিয়ে শ্বাস রোধ করলে হামিদা নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এরপর তাঁকে ট্রাক থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়। এ সময় জিরাব তাঁর ভাতিজাকে (১৫) আরও মারতে বলেন। ওই কিশোর ট্রাকে থাকা লোহার পাইপ দিয়ে হামিদার মাথায়, পিঠে আঘাত করে। মৃত্যু নিশ্চিত করে ট্রাকে থাকা বালিশ, কাঁথা ঘটনাস্থলে মৃতদেহের কাছে ফেলে তাঁরা চলে যান।

পাটগ্রাম থানার ওসি সুমন কুমার মহন্ত বলেন, ক্লুলেস (সূত্রহীন) হত্যা মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়। এরপর শেরপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ২০ ও ২১ এপ্রিল হত্যাকাণ্ডে জড়িত ট্রাকচালক জিরাব আলী (২৮), তাঁর ভাতিজা (১৫), ট্রাকের দালাল শমসের আলী ও শফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রধান দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন