default-image

দখল-দূষণে অস্বাস্থ্যকর জায়গাটি দেখে এলাকাবাসী কখনো ভাবতেই পারেননি এখানেও বুক ভরে নিশ্বাস নেওয়া সম্ভব। এখন সেই জায়গায় প্রাতর্ভ্রমণ–সান্ধ্যভ্রমণ সেরে নিচ্ছেন অনেকে। বুকভরা শ্বাস নিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। কারণ, দখল হটিয়ে সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে)।

সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্মাণাধীন হাঁটার পথটির এরই মধ্যে প্রায় এক কিলোমিটার দৃশ্যমান হয়েছে।

নগরীর তারাপুর চা-বাগান থেকে সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার কালীবাড়িছড়াটি শতাধিক মহল্লা ঘুরে সুরমা নদীতে গিয়ে মিশেছে। ‘ওয়াকওয়ে’ প্রকল্পে কালীবাড়িছড়ার উৎসমুখে সব মিলিয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার হাঁটার পথ বের হয়েছে; যে পথ ছড়ার দখলের সঙ্গে মিইয়ে যেতে বসেছিল প্রায়।

এলাকাটির একপাশে জনবসতি, আরেকদিকে চা-বাগান। টিলার পাদদেশ পুরোটাই একটি ছড়ার উৎসমুখ। বিভিন্ন মহল্লা ঘুরে ছড়াটি সুরমা নদীতে গিয়ে মিশেছে। ছড়ার উৎসমুখ ছিল দখল ও দূষণে শীর্ণকায় এক রূপ। দখল হটিয়ে ছড়ার তীর সংরক্ষণ করে হাঁটার পথ নির্মাণ শুরুর পর সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পরিপূর্ণ চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছে। নগরবাসীর সুযোগে হয়েছে হাঁটার। সকাল, দুপুর, বিকেলেও চলে হাঁটাহাঁটি। এর মধ্যে বিকেলে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীরও সমাগম হয়।

এভাবে শুধু কালীবাড়িছড়া নয়, নগরীর প্রাকৃতিক ছড়া-খাল দখলমুক্ত করে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করার উদ্যোগ নিয়েছে সিটি করপোরেশন। নগরীর দক্ষিণ-মধ্যভাগ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সুরমা নদী। উত্তর-পূর্বে চা-বাগানের টিলাভূমি। টিলা থেকে প্রাকৃতিকভাবে আসা নয়টি ছড়া এবং তিনটি খাল নগরের বিভিন্ন মহল্লা ঘুরে সুরমা নদীতে গিয়ে মিশেছে।

সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের তথ্যমতে, ১২টি ছড়া-খালই নগরকে জলাবদ্ধতামুক্ত রাখতে জলপ্রবাহের প্রাকৃতিক ধারা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রাকৃতিক জলপ্রবাহকে সচল করে জলাবদ্ধতামুক্ত সিলেট নগর গড়তে ১৫০ কোটি টাকার কাজ বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে চলমান রয়েছে। এই প্রকল্পের একটি হচ্ছে দখলমুক্ত ছড়া ও খালের তীর সংরক্ষণ করে ওয়াকওয়ে নির্মাণ।

প্রকল্প সূত্র জানায়, ১১টি ধাপে জবরদখলের তালিকা তৈরি করে ছড়া-খালের আয়তন নির্ধারণ করতে ১৯৫৬ সালের রেকর্ড অনুসরণ করা হয়। দখলমুক্ত করার অভিযান চলে ধারাবাহিকভাবে। দখলমুক্ত অংশে প্রাথমিকভাবে নগরীর দর্শনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ চারটি স্থানে ওয়াকওয়ে নির্মাণকাজ শুরু হয়। চলমান এই প্রকল্পে টিলাগড় এলাকার হাতিম আলী উচ্চবিদ্যালয়–সংলগ্ন হলদিছড়ায় ১ দশমিক ২৫ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে, একই ছড়ায় নগরীর শাহজালাল উপশহর এলাকায় এক কিলোমিটার, দাড়িয়াপাড়া এলাকা দিয়ে প্রবাহিত মুগনিছড়ায় ৩০ মিটার, নগরীর উত্তর-পূর্ব দিকে শাহি ঈদগাহ, টিবি গেট ও এমসি কলেজ এলাকার গোয়ালীছড়ায় ৩৫ মিটার, গোয়াবাড়ি-করেরপাড়া এলাকায় কালীবাড়িছড়ায় দেড় কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। ওয়াকওয়ের সঙ্গে ছড়া-খালের প্রতিরক্ষাদেয়াল নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন পথ পাওয়া যাবে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আলী আকবর জানিয়েছেন, ওয়াকওয়ে প্রকল্পটি সিলেট নগরীতে এই প্রথম বাস্তবায়ন হয়েছে। নগরীর ১২টি ছড়া-খালে ওয়াকওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে হাঁটার নতুন পথ পাওয়া যাবে। পথটি নাগরিক পরিসর হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ আসবে।

গোয়াবাড়ি-করেরপাড়া এলাকায় কালীবাড়িছড়ার উৎসমুখের ওয়াকওয়ের প্রায় ৫০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এরই মধ্যে হাঁটার পথ দৃশ্যমান হওয়ার পর সেটি নাগরিক পরিসর হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়েছে।

গোয়াবাড়িবাজার এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রতিদিন বিকেলে আশপাশের এলাকা ছাড়াও নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন ওয়াকওয়ে দেখতে আর হাঁটতে আসছেন। এর মধ্যে ছুটির দিনে পর্যটনকেন্দ্রের মতো ভিড় হয়।

গতকাল শনিবার দুপুরবেলাও ওয়াকওয়ে দিয়ে লোকজনকে হাঁটতে দেখা গেছে। আগের দিন বিকেলে দর্শনার্থীদের বেশি ভিড় হওয়ায় দুপুরে ওয়াকওয়ে দেখতে গেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, উৎসমুখে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ের মাধ্যমে পুরো এলাকার চিত্র পাল্টে দেওয়ার অবকাশ তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন বিকেলে হাজারো মানুষের ভিড় হয়।

আবদুল করিম চৌধুরী আরওে বলেন, দর্শনার্থীর চাপে ওয়াকওয়ে যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, এ জন্য সিটি করপোরেশনের উচিত চলমান এই প্রকল্পকাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা এবং সেই সঙ্গে নজরদারির ব্যবস্থা করা।

ওয়াকওয়ে প্রকল্পটি গত অর্থবছরে শেষ হওয়ার কথা ছিল বলে জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে অনেক প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে। তবে ওয়াকওয়ে সিটি করপোরেশনের নতুন বাস্তবায়ন করা একটি প্রকল্প, তাই আমাদের চেষ্টা থাকবে দ্রুত কাজ শেষ করা।’

ছড়া-খাল দখলমুক্ত করে হাঁটার নতুন এই পথ দৃশ্যমান হওয়ায় এসব ঘিরে পর্যটন পরিকল্পনাও আছে জানিয়ে মেয়র বলেন, ‘সিলেট নগরীতে সুরমা নদীর তীর, কিনব্রিজ ও আলী আমজদের ঘড়িঘর নাগরিক পরিসর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আর কোনো ফাঁকা জায়গা নেই। আমরা ছড়া-খালের তীর দখলমুক্ত করে নাগরিক পরিসর হিসেবে ব্যবহার করার চিন্তাভাবনা করছি।’

মেয়র বলেন, যেসব ছড়া-খালে ওয়াকওয়ে আছে, সেখানে খনন করে পানির প্রবাহ বাড়ানো হবে। সেখানে সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থাও রাখা হবে। ওয়াকওয়েতে রাতে চলাচল করতে লাইট স্থাপন ও ফটকব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। দিন ও রাতে সময় নির্ধারণ করে লোকজনকে হাঁটতে দেওয়া হবে। ফটকে নিয়মিত পাহারাদার রেখে সামগ্রিক নজরদারি সিটি করপোরেশন থেকে করা হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন