১৯৮৫ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় সুধীজন পাঠাগারের উদ্যোগে প্রকাশিত নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস বইয়ে উল্লেখ আছে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরের পাট দেশের বাজারে চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হতো। এ কারণে এই শহরকে প্রাচ্যের ড্যান্ডি বলে অভিহিত করা হয়। সুলতানি আমলে সোনারগাঁ যখন বাংলার রাজধানী, তখন শীতলক্ষ্যার পূর্বপাড়ের কদমরসুল, মদনগঞ্জ ব্যবসা–বাণিজ্যের জন্য সমৃদ্ধিশালী এলাকা। মরক্কোর বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা সোনারগাঁয়ে অনেক দিন অবস্থান করেন। মোগল আমলে শীতলক্ষ্যার পশ্চিমপাড়ে ব্যবসা জমে ওঠে। ইংরেজদের আগমনের পূর্বে বন্দর, খিজিরপুর প্রভৃতি বাজার ছিল জমজমাট। ঢাকায় ইংরেজদের ব্যবসাকেন্দ্র স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে শীতলক্ষ্যার পশ্চিম তীর গুরুত্ব পায়। ১৮৬২ সালে নারায়ণগঞ্জের ব্যবসাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক উন্নতি সাধিত হয় স্টিমার সার্ভিস চালু হওয়ার পর।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিতাইগঞ্জ বর্তমানে আটা-ময়দা, ডাল, তেল, চিনি, লবণ, গোখাদ্যসহ বিভিন্ন মালের পাইকারি ব্যবসার জন্য প্রসিদ্ধ। একসময় এখানে উৎপাদিত ভোগ্যপণ্য দেশের ৪০টি জেলায় সরবরাহ করা হতো। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতিসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে বরিশাল, সিলেট, ফরিদপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লাসহ ১০-১২টি জেলায় নিতাইগঞ্জ থেকে প্রতিদিন ভোগ্যপণ্য সরবরাহ করা হয়। নিতাইগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭২টি আটা-ময়দার মিল রয়েছে। ১০০টির বেশি চালের আড়ত, ৫০টির মতো গমের আড়ত, ডালের আড়ত ১০০টি, লবণের ৫০টি, তেল-চিনির প্রায় ৪০০টি, ময়দার ৬৮টি, ছোট–বড় মিলিয়ে ভুসি মালের (গোখাদ্য) সহস্রাধিক আড়ত রয়েছে।

নিতাইগঞ্জের আটা-ময়দা ব্যবসায়ী ওয়াজেদ আলী বলেন, নিতাইগঞ্জে আগের জৌলুশ নেই। নানা কারণে নিতাইগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায় প্রভাব পড়েছে। আগে মোকাম সকাল সাতটায় শুরু হতো। রাত ৯টা থেকে ১০টায় শেষ হতো। এখন বেচাকেনা শুরু হয় সকাল নয়টায়। চলে বিকেল পাঁচ-ছয়টা পর্যন্ত।

নিতাইগঞ্জের পাশে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে সিটি গ্রুপ, এসিআই, টিকে গ্রুপ ভোগ্যপণ্য উৎপাদন করছে। এসব আধুনিক কারখানায় উৎপাদিত খাদ্যপণ্য প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জেলা-উপজেলায় সরবরাহ করছে। করপোরেট ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ টন কাঁচামাল আমদানি করছেন। উৎপাদন খরচ কম পড়ছে। এ কারণে তাঁরা নিতাইগঞ্জের ব্যবসায়ীদের তুলনায় কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে পারছেন।

ব্যবসায়ীদের মতে, নিতাইগঞ্জে বাকিতে পণ্য কিনতে পারেন ব্যবসায়ীরা। সারা বছর ব্যবসা করার পর পয়লা বৈশাখের হালখাতায় বকেয়া পরিশোধ করে। কিন্তু ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাকিতে ব্যবসায়ীদের এ সুবিধা দেয় না। এ কারণে নিতাইগঞ্জ ঐতিহ্য ধরে রাখবে বলে মনে করেন তাঁরা।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ব্যবসার প্রসারের কারণে নিতাইগঞ্জের সড়কগুলো প্রশস্তভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে বিভিন্ন পণ্যবাহী ট্রাক সব সড়কে ঢুকতে পারে না। কোনো ট্রাক সড়কে ঢুকলে যানজট লেগে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শহরের যানজট কমাতে দিনের বেলায় মাল ওঠানামা সীমিত করেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। এতে করে ব্যবসায় প্রভাব পড়েছে। ব্যবসায় ব্যয় বাড়ছে।

নিতাইগঞ্জ পাইকারি ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শংকর সাহা বলেন, নানা সংকটেও ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় নিতাইগঞ্জের কদর কখনো কমবে না। যত করপোরেট প্রতিষ্ঠান আসুক না কেন, নিতাইগঞ্জ টিকে আছে, টিকে থাকবে। যেহেতু দিন দিন জনসংখ্যা বাড়ছে, ভোগ্যপণ্যের চাহিদাও বাড়ছে। এ ব্যবসাও টিকে থাকবে।

নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খালেদ হায়দার খান প্রথম আলোকে বলেন, নিতাইগঞ্জ দেশের অন্যতম পাইকারি ব্যবসাকেন্দ্র। কিন্তু এখানে মালামাল ওঠানো-নামানো ও যানজটের সমস্যা প্রকট। এ কারণে ব্যবসা–বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, ব্যবসায়ীদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।