বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দুর্ঘটনার পর ডুবে যাওয়া নৌযানে বোটমাস্টার পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার স্বরূপকাঠি এলাকার মহিউদ্দিন, একই এলাকার রবিউল, নূর আলম, পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার জিহাদ ও বাগেরহাটের মোংলার সামসু নিখোঁজ হন।

ঘটনার সময় গতকাল রাতেই জীবিত উদ্ধার নাবিকেরা হলেন ভান্ডারিয়া উপজেলার পাইটখালী গ্রামের রায়হান চৌধুরী এবং বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলার মাকরডোন নারিকেলতলা এলাকার মো. রুবেল।

দুর্ঘটনার প্রায় ২০ ঘণ্টা পর দুজনের মরদেহ উদ্ধার হলেও তাৎক্ষণিক তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের গোয়েন্দা কর্মকর্তা লে. কমান্ডার মো. হাসানুজ্জামান বলেন, খরব পেয়ে রাতেই কোস্টগার্ডের সদস্যরা ওই এলাকায় পৌঁছান। ডুবে যাওয়া নৌযানে থাকা নিখোঁজ পাঁচজনের মধ্যে দুজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এখনো তিনজন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ নাবিকদের উদ্ধারে কোস্টগার্ডের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধার হওয়া মরদেহ দুটি মোংলা থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।

কয়লা পরিবহনের উপযুক্ত ছিল না বাল্কহেডটি

বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের সঙ্গে ধাক্কায় মোংলা সমুদ্রবন্দরের পশুর নদে ডুবে যাওয়া নৌযানটির কয়লা নিয়ে চলাচলের অনুমতি ছিল না। বেআইনিভাবে এটি পণ্য পরিবহন করছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

মোংলা বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ডুবে যাওয়া এমভি ফারদিন-১ নামের নৌযানটি হারবাড়িয়ার ৯ নম্বর অ্যাঙ্করে থাকা বিদেশি জাহাজ এমভি এলিনাবি থেকে গত বুধবার সন্ধ্যায় প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন কয়লা বোঝাই করে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের আমদানি করা ওই কয়লা নিয়ে ফারদিন-১ ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পরপরই হারহাড়ির ৯ নম্বর অ্যাঙ্কর থেকে মাত্র ৭০০ গজ দূরে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। সে সময় পানামা পতাকাবহী জাহাজ হ্যান্ডিপার্ক (মাদার ভেসেল) বন্দর ত্যাগ করছিল। বিপরীত থেকে আসা ওই জাহাজের সঙ্গে ধাক্কায় বাল্কহেড মুহূর্তে ডুবে যায়।

বন্দর সূত্র বলছে, বাল্কহেডে করে কয়লাসহ এ ধরনের পণ্য পরিবহনের কোনো অনুমতি নেই। কারণ, বাল্কহেড এক হ্যাচ–বিশিষ্ট। বালু বা এ ধরনের পণ্য পরিবহনের জন্যই কেবল বাল্কহেড ব্যবহার করা হয়। তা ছাড়া চলাচলের জন্য বাল্কহেডটির নিজস্ব কোনো যোগাযোগব্যবস্থা (যান্ত্রিক বার্তা আদান-প্রদান) নেই। ফলে ওই সময়ে যে মার্চেন্ট শিপ মুভমেন্ট হচ্ছিল, তা বাল্কহেডটি জানত না।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে কয়লা পরিবহন বন্ধ করতে হবে। বিভিন্ন সময় এই নৌপথে কয়লা, সারসহ নানা উপদান নিয়ে নৌযানডুবি সুন্দরবনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।
নুর আলম শেখ, আহ্বায়ক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা), মোংলা

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার শেখ ফখরুদ্দীন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, বন্দর ও জাহাজের মালিকপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। যেখানে এটি ডুবেছে, তা মোংলা বন্দরের মূল চ্যানেলের বাইরে। তাই বন্দরের জাহাজ চলাচলে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। ডুবে যাওয়া ওই নৌযানটিতে ৩৫০ মেট্রিক টন কয়লা ছিল বলে জানা যায়। তবে কয়লার পরিমাণ কিছু কমবেশি হতে পারে।

ডুবে যাওয়া নৌযানটি উদ্ধারের বিষয়ে শেখ ফখরুদ্দীন বলেন, বন্দর চ্যানেলের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে বন্দর কর্তৃপক্ষই এটি উদ্ধার করবে। আর চ্যানেলের নিরাপত্তার সমস্যা না হলে জাহাজের মালিক কর্তৃপক্ষকে উদ্ধারের জন্য সময় দেওয়া হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে হারবার মাস্টার বলেন, আইনত ওই নৌযানটি এখান থেকে কয়লা পরিবহন করতে পারে না। কয়লা বা অন্য বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ডাবল চেম্বার বা হ্যাচ ছাড়া নৌযান বাধ্যতামূলক। সিঙ্গেল চেম্বার হ্যাচের নৌযানে এগুলো পরিবহন করতে পারবে না। ডুবে যাওয়া নৌযান একটি হ্যাচের।

নৌযান ডুবির ওই ঘটনায় আজ মঙ্গলবার বিকেল সোয়া পাঁচটা পর্যন্ত মোংলা থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মোংলার আহ্বায়ক নুর আলম শেখ বলেন, ‘কয়লা একটি বিষাক্ত পদার্থ। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে কয়লা পরিবহন বন্ধ করতে হবে। কয়লাদূষণের ফলে পশুর নদে জলজ পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে। বিভিন্ন সময় এই নৌপথে কয়লা, সারসহ নানা উপদান নিয়ে নৌযানডুবি সুন্দরবনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।’ তিনি আরও বলেন, সুন্দরবন প্রতিদিন জোয়ারে দুবার প্লাবিত হয়। তখন এই দূষিত পানি বনের জলজ প্রাণীর পাশাপাশি গাছপালার ক্ষতি করবে। অনেক ক্ষেত্রেই ত্রুটিপূর্ণ নৌযানের কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এসব ক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বহিনী, বিআইডব্লিউটিএসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

কয়লা থেকে দূষণের শঙ্কার বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের বাগেরহাট কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আরেফিন বাদল প্রথম আলোকে বলেন, কয়লাতে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর উপাদান থাকে। কয়লাতে থাকা আর্সেনিক, সালফারসহ এ ধরনের উপাদান দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকলে তা পানিতে দূষণ ঘটাতে পারে। এতে পানি ও জলজ জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হবে। দূষণ রোধে তাই যত দ্রুত সম্ভব কয়লাসহ ডুবে যাওয়া ওই নৌযান অপসারণ করতে হবে। ওই নৌযানডুবির ফলে পানিতে কোনো দূষণ হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষার জন্য খুলনার বিভাগীয় কার্যালয় থেকে পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন