বান্দরবানে রুমা উপজেলার দুর্গম গ্রাম তামলাওপাড়া। গ্রামে যেতে গেলে হাঁটা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। ফলে স্বাস্থ্যকর্মীদের যাতায়াত কম। শীত বাড়ায় পাড়াটিতে এখন কষ্টে আছে বাসিন্দারা। শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে জ্বর ও হামে। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ছয়জন শিশু পাওয়া গেছে। উপজেলা সদর থেকে যাওয়া চিকিৎসাসেবা দলের সদস্যরা এই শিশুদের শনাক্ত করেন।

রুমা উপজেলার রেমাক্রি প্রাংসা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের তামলাওপাড়াটি তাজিংডং পাহাড় পার হয়ে মিয়ানমারের সীমান্তের কাছাকাছি। রুমা উপজেলা সদর থেকে ৫৫ কিলোমিটার হলেও থানচি উপজেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান। গতকাল পাড়াটিতে যাওয়া চিকিৎসাসেবা দলের সঙ্গে এ প্রতিবেদকসহ কয়েকজন সাংবাদিকও ছিলেন। তাজিংডং পার হয়ে কিছু দূর হাঁটার পর তামলাওপাড়া। এখানে বসবাস ৩৪টি বম পরিবারের। চারদিকে বনাঞ্চল। পাড়ার বম পরিবারগুলোর ছোট ছোট বাঁশের ঘর দেখলেই বোঝা যায় তাঁরা অত্যন্ত দরিদ্র।

পাড়ার কার্বারি (পাড়াপ্রধান) রুয়ালসাং বম বলেন, গত সপ্তাহে ঠান্ডা বেড়ে যাওয়ায় শিশুরা জ্বরে আক্রান্ত হয়। দু-এক দিন জ্বরের পর সারা শরীরে চুলকানির মতো দেখা দেয়। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য বিভাগকে জানিয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পাড়ার অধিকাংশ শিশুর শরীরে গরম কাপড় নেই। এক সপ্তাহ ধরে হামে ভোগা নয় বছরের লালদাইসাং বমের গায়ে হাফপ্যান্ট ও পাতলা একটি গেঞ্জি। সে জানায়, রাতে ও সকালে বেশি শীত অনুভূত হলে রান্নার চুলার আগুনের পাশে বসে থাকে।

তিন বছরের বানথার, দুই বছরের বানকুয়াম সাং, পাঁচ বছরের রোদেক বমের শরীরেও কোনো গরম কাপড় নেই। বানথারের মা বানকুম বম বলেন, গরম কাপড় না থাকলেও তিনি সকাল-বিকেল মেয়েকে কাপড় দিয়ে তাঁর শরীরে বেঁধে রাখেন। এ জন্য শীত লাগে না। পাড়ায় ১ থেকে ১০ বছরের কোনো শিশুর শরীরে গরম কাপড় নেই। শিশুদের দেহের গড়ন দেখে বোঝা যায় অপুষ্টিতে ভুগছে তারা।

রেমাংক্রি প্রাংসা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রাম ময় বম বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো কর্মী নিয়মিত পাড়ায় আসেন না। আবার পাড়াবাসীও অসচেতনতার কারণে অনেকে টিকা নিতে আগ্রহী নয়। তাদের ধারণা টিকা দিলে শিশুরা অসুস্থ হয়।

রামকোয়াল বমের পাঁচ বছর ছেলে ও দুই বছরের মেয়ে রয়েছে। ছেলের টিকা দিলেও দুই বছরের মেয়েকে এখনো হাম-রুবেলার টিকা দেননি। টিকা দিয়ে ছেলের জ্বর হয়েছিল। এ জন্য মেয়েকে টিকা দিতে চান না।

চিকিৎসাসেবা দলের প্রধান চো চো মং মারমা বলেন, তাঁরা হামে আক্রান্ত ছয়জন শিশু পেয়েছেন। প্রত্যেকটি শিশু চরম অপুষ্টিতে ভুগছে। দুর্বল শিশুদের শীতের গরম কাপড় না থাকায় জ্বর ও হাম হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, রেমাক্রি প্রাংসা ইউনিয়নের সব ওয়ার্ড দুর্গম হওয়ায় হাম-রুবেলার জন্য উচ্চমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা সেখানে সহজে যেতে পারেন না। শীত বাড়লে তামলাওপাড়াসহ ওই এলাকায় দরিদ্র শিশুদের হাম, রুবেলাসহ শীতজনিত রোগের প্রকোপ আরও বাড়তে পারে।

রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) বামং মারমা বলেন, হামে আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ পাওয়ার পর তামলাওপাড়ায় চিকিৎসাসেবার দল পাঠানো হয়েছে। সেখানে আপাতত কোনো সমস্যা নেই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0