৭ মে বেলা ১১টার দিকে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার মহিষভাঙ্গা এলাকায় বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কে ন্যাশনাল ট্র্যাভেলসের বাসের সঙ্গে সিয়াম পরিবহনের বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ছয়জন এবং পরে স্থানীয় হাসপাতালে একজনের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। তাঁদের একজন রবিউল।

গতকাল বুধবার বিকেলে এই প্রতিবেদককে কল করেন রবিউলের স্ত্রী। পরে সন্ধ্যার আগে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, রবিউল শুয়ে আছেন। পাশেই স্ত্রী সাজেদা বেগম বসা। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন বড় ভাই হানিফ। রবিউলের বাঁ হাতের অবশিষ্ট অংশ বালিশে রাখা। কীভাবে হাতটি হারালেন, তা বলতে পারলেন না। শুধু বললেন, ‘কিছুই মনে নেই।’ আর আক্ষেপ নিয়ে বলার চেষ্টা করলেন, ‘পরিবহনের কেউ আমার পাশে নেই। অথচ কত পরিশ্রম করেছি!’

স্ত্রী সাজেদা বলেন, দুপুরে তাঁর ননদেরা এসেছিলেন ভাইকে দেখতে। সঙ্গে এসেছিল তাঁদের তিন বছরের ছেলে আবদুল বারী। বাবার এ অবস্থা দেখে সে খুব কেঁদেছে। এ অবস্থা দেখে বড় ছেলে আরিফ হোসেনকে (৫) তাঁরা হাসপাতালে না আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রবিউলের স্ত্রীর আক্ষেপের শেষ নেই। তিনি বলেন, যেদিন দুর্ঘটনার শিকার হলেন রবিউল, তার আগের দিন তিনি বেরিয়ে যান। সেদিন রাতে বাড়ি ফেরেননি। এভাবে তিনি মাঝেমধ্যেই বাড়িতে আসতেন না। বলতেন, মালিক আসতে দিচ্ছেন না। বাস নিয়ে অমুক জায়গায়, তমুক জায়গায় যেতে হবে। রবিউল নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাসমালিকের পক্ষ থেকে একবার শুধু ফোন করা হয়েছিল। তাঁরা বলেন, সুস্থ হলে তাঁরা সহযোগিতা করবেন। কিন্তু সহযোগিতা তো এখন দরকার। প্রতিদিন ওষুধ লাগে। সব বাকিতে নেওয়া হচ্ছে।

সাজেদা আরও বলেন, ‘রবিউল সেরে উঠছেন ধীরে ধীরে। কিন্তু সামনে কী করব? ছোট ছোট দুই ছেলে আছে। তাদের খাওয়াব কী করে? জায়গাজমিও কিছু নেই। এখন তো আমাদের সামনে ঘোর অন্ধকার দেখা যাচ্ছে।’ রবিউলকে পাশে রেখেই কথাগুলো বলছিলেন স্ত্রী। রবিউল শুনে কিছুই বলতে পারছিলেন না।

রবিউলের বড় ভাই হানিফ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ আনেন। তিনি বলেন, ‘ভাই রাজশাহী জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের কার্ডধারী সদস্য। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে একজন দুর্ঘটনার দিন ভর্তি করিয়ে এক হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেছেন। ভাই আমার সুস্থ হচ্ছে। দুর্ঘটনার পরই বাঁ হাতে অপারেশন হয়েছে। হাতটি তো আর জোড়া লাগবে না। আমাদের তো কিছুই নেই।’

পুঠিয়া থানা সড়ক পরিবহন ইউনিয়নের সহসভাপতি নুরুল আমিন বলেন, তিনি ভর্তির সময় এসেছিলেন। ১৭ মে পুঠিয়াতে শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন। তিনি সভাপতি প্রার্থী। এ কারণে ব্যস্ততার জন্য আসতে পারছেন না। তবে তিনি পাশে আছেন এবং যোগাযোগ রাখছেন।

সিয়াম পরিবহনের মালিক আমজাদ হোসেন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ওই দিন ওই গাড়িতেই ছিলেন। যেখানে দুর্ঘটনা ঘটে, তার এক কিলোমিটার আগে তিনি নেমে যান। দুর্ঘটনার পর অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করান তিনি। পরে সেখান থেকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তিনি নিজেও ট্রমার মধ্যে আছেন, অসুস্থ। তিনি রবিউলের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর জন্য অর্থ জোগাড় করছেন। পরিবারটা যেন চলতে পারে, এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি কিছু করার কথা ভাবছেন।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন