বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
প্রাণী নেই, পার্কের জৌলুশ নেই। এ জন্য দেশের প্রথম সাফারি পার্কটি দর্শনার্থী টানতে পারছে না। এই পার্কে সরকারি নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
লুৎফুল কবির, সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), চকরিয়া

বর্তমানে পার্কে আছে জেব্রা, ওয়াইল্ড বিস্ট, জলহস্তী, ময়ূর, অজগর, কুমির, হাতি, বাঘ, ভালুক, সিংহ, হরিণ, লামচিতা, শকুন, কচ্ছপ, রাজধনেশ, কাকধনেশ, ইগল, সাদা বক, রঙিলা বক, সারস, কাস্তেচরা, মথুরা, নিশিবক, কানিবক, বনগরুসহ ৫২ প্রজাতির ৩৪১টি প্রাণী। এগুলো আবদ্ধ অবস্থায় আছে। এ ছাড়া উন্মুক্তভাবে আছে ১২৩ প্রজাতির ১ হাজার ৬৫টি প্রাণী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গুইসাপ, শজারু, বাগডাশ, মার্বেল ক্যাট, গোল্ডেন ক্যাট, ফিশিং ক্যাট, খ্যাঁকশিয়াল ও বনরুই। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দর্শনার্থী ও গবেষণার জন্য স্থাপিত বহু স্থাপনা নষ্ট হচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), চকরিয়ার সভাপতি লুৎফুল কবির বলেন, প্রাণী নেই, পার্কের জৌলুশ নেই। এ জন্য দেশের প্রথম সাফারি পার্কটি দর্শনার্থী টানতে পারছে না। এই পার্কে সরকারি নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

default-image

৮ বছর ধরে বন্ধ প্রকৃতি বীক্ষণকেন্দ্র

বাংলাদেশের বন্য প্রাণী ও বনাঞ্চল সম্পর্কে দর্শনার্থীদের প্রাথমিক ধারণা দিতে ২০০৬ সালের ২৬ এপ্রিল প্রকৃতি বীক্ষণকেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পার্কের প্রধান ফটকের পাশে এই কেন্দ্র। ১২ মিনিটের একটি শোতে ২০ জনের একটি দলকে ২০০ টাকা মূল্য গুনতে হতো। তবে ২০১২ সাল থেকে কারিগরি দক্ষ লোকের অভাবের কারণে কেন্দ্রটি বন্ধ। এই কেন্দ্রের ভেতরটি বেহাল। তার, বাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে গেছে।

পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই প্রকৃতি বীক্ষণকেন্দ্র নির্মাণ করেছিল। ছয় বছর পর্যন্ত ওই প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মচারী বীক্ষণকেন্দ্রটি চালাতেন। তিনি চলে যাওয়ার পর থেকে দক্ষ লোকের অভাবে এটি বন্ধ আছে।

প্রাণীর ভাস্কর্য ও মানচিত্রে ধুলার স্তর

পার্কের পথে পথে দর্শনার্থীর চোখে পড়ে প্রাণীর ভাস্কর্য। এর মধ্যে ডাইনোসর, জেব্রা, জিরাফ, ময়ূর, হাতির শাবক ও পাখির ভাস্কর্য নজর কাড়ে দর্শনার্থীদের। পার্কের প্রবেশ ফটকের ডান পাশে একটি মানচিত্র আছে। এই মানচিত্র ধরে মানুষ পার্কের ভেতরের প্রাণিকুলের অবস্থান নির্ণয় করে দেখতে যায়, কিন্তু এটি বেহাল। রং নেই। এটি ঢেকে গেছে ধুলার আস্তরণে।

বনাঞ্চলে ঘেরা ২ হাজার ২৫০ একর পার্কটির ১ হাজার ৫০০ একরে সীমানাপ্রাচীর আছে। বাকি এলাকায় সীমানাপ্রাচীর নেই। অরক্ষিত সীমানা দিয়ে লোকজন ভেতরে ঢুকে গাছপালা নিধন ও পশু–পাখি শিকার করেন বলে অভিযোগ আছে। বন্য হাতির দল অরক্ষিত সীমানায় এসে তাণ্ডব চালায়।

সীমানা অরক্ষিত
বনাঞ্চলে ঘেরা ২ হাজার ২৫০ একর পার্কটির ১ হাজার ৫০০ একরে সীমানাপ্রাচীর আছে। বাকি এলাকায় সীমানাপ্রাচীর নেই। অরক্ষিত সীমানা দিয়ে লোকজন ভেতরে ঢুকে গাছপালা নিধন ও পশু–পাখি শিকার করেন বলে অভিযোগ আছে। বন্য হাতির দল অরক্ষিত সীমানায় এসে তাণ্ডব চালায়। তবে পার্ক কর্তৃপক্ষ বলছে, সাড়ে ৭০০ একর এলাকায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে উন্মুক্ত রয়েছে।

২০০৯-১০ অর্থবছরে সাফারি পার্কের প্রবেশপথের সামনে বঙ্গবন্ধুর একটি ম্যুরাল স্থাপন করা হয়। ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ম্যুরালটি নির্মিত হলেও ধুলাবালুতে ভরে আছে সেটি।

জনবলসংকটের কারণে ঠিকমতো দেখাশোনা সম্ভব হয় না দাবি করে পার্কের একজন কর্মকর্তা বলেন, সাফারি পার্কে বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ৫৬। পদসংখ্যা ৭৯ (রাজস্ব খাতে ৫৭ ও প্রকল্পে ২২)। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে একজন বিভাগীয় বন কর্মকর্তাসহ (ডিএফও) আরও ২২ জনের জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে।

বাঘ-সিংহ উন্মুক্তকরণ প্রকল্প
পার্ক সূত্র জানায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সাফারি পার্কের উন্নয়নে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) ১২৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পাস হয়েছে। তবে করোনার কারণে এ বরাদ্দ থমকে গেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে মাত্র ২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ অর্থ খরচ করে পার্কের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটা সম্পন্ন হলে সাফারি চালু হবে। বিশেষ করে বাঘ, সিংহসহ সব তৃণভোজী প্রাণী উন্মুক্ত করা হবে। ক্যাপটিভ ব্রিডিং বা আবদ্ধ প্রজনন চালু হবে। আবদ্ধ প্রজননের পর প্রাণিকুল সাফারিতে ছাড়া হবে। একটি রেসকিউ সেন্টার স্থাপন করা হবে। একটি বাটারফ্লাই পার্ক, পার্কের গেটের সামনে চিলড্রেন এমিউজমেন্ট পার্ক নির্মাণ করা হবে। নতুন করে চারটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ, কাঠের সেতুগুলো নতুন করে নির্মাণ, পার্কের ভেতরের সড়ক প্রশস্ত ও মেরামত করা হবে।

মহাপরিকল্পনায় আট থেকে দশ কোটি টাকার প্রাণী কেনা হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জিরাফ, আফ্রিকান প্রাণী, জেব্রা, নীলগাই ও চিতাবাঘ। এসব প্রাণী পার্কে ঢুকলে পূর্ণতা আসবে বলে মনে করেন পার্কের কর্মকর্তারা।

ইতিমধ্যে কাজ শুরুর কথা জানিয়ে সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাজাহারুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এটি দেশের প্রথম সাফারি পার্ক। এই পার্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে সব মিলিয়ে ৭০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ হয়েছে। তবে যে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে পাল্টে যাবে পার্কের চেহারা। তখন প্রাণিকুল থাকবে উন্মুক্ত আর নিরাপত্তাবেষ্টিত গাড়িতে চড়ে তাদের দেখবেন দর্শনার্থীরা। তখন পার্কের আয়ও বেড়ে যাবে কয়েক গুণ।

পার্ক সূত্র জানায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে পার্কটি ইজারা হয় এক কোটি তিন লাখ টাকায়। এ ছাড়া গাড়ি রাখার জায়গা ১০ লাখ এবং রেস্তোরাঁ ও ভ্রমণস্থান ১০ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়।

পার্কের ইজারাদার ফজলুল করিম সাঈদী বলেন, লকডাউনের কারণে এত দিন পার্ক বন্ধ ছিল। ২০ আগস্ট থেকে পার্ক খুলে দেওয়ার পর দৈনিক এক হাজারের বেশি দর্শনার্থী আসছেন। সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো গেলে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে। করোনার আগে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার দর্শনার্থী পার্কটি ঘুরে দেখতেন।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন