ধুনটে বকচরের মেলায় মানুষের ঢল

বকচরের মেলায় নাগরদোলা। বুধবার দুপুরে বগুড়ার ধুনট উপজেলার বকচর এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

বগুড়ার ধুনট উপজেলায় বকচরের মেলায় মানুষের ঢল নেমেছে। আজ বুধবার সকাল থেকে উপজেলার বকচর এলাকায় মানুষের ঢল নামে। মাঘ মাসের তৃতীয় সপ্তাহের বুধবার মূল মেলা শুরু হয়। তবে মূল মেলার আগের দিন ও পরের দিনও মেলা চলে। মেলায় মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। শতাধিক বছর ধরে চলে আসছে এই মেলা।

মেলার দু-তিন দিন আগে থেকেই এলাকার বাড়িতে বাড়িতে মেয়ে ও মেয়ের জামাতাসহ আত্মীয়স্বজনে ভরে যায়। মেলার প্রধান আকর্ষণ জামাইদের মাছ ও মিষ্টি কেনাকাটার প্রতিযোগিতা। এবার করোনা সংক্রমণের কারণে বিধিনিষেধ থাকায় সরকারিভাবে মেলার অনুমতি মেলেনি। তবে ঐতিহ্যবাহী এই মেলার তারিখ আগে থেকেই নির্ধারিত থাকায় দর্শনার্থীদের ঢল ঠেকানো যায়নি।

এ বছর সরকারিভাবে মেলার অনুমতি নেই বলে জানালেন মেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি সাইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, শতাধিক বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখতেই স্বাস্থ্যবিধি মেনেই আয়োজন করা হয়েছে মেলার।

স্থানীয় বেশ কয়েকজন বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ধুনটের কালেরপাড়া ইউনিয়নের রামনগর, ঈশ্বরঘাট, হেউটনগর কোদলাপাড়া নামের চারটি গ্রামের মাঝখানে বিশাল একটি ফসলের মাঠ। এই মাঠের মাঝখানে আছে বড় একটি বিল। একসময় মাছ শিকারের জন্য বিলে আসত প্রচুর বকপাখি। এ জন্য বিলের নামকরণ হয়েছে বকচরের বিল। শতাধিক বছর থেকে এলাকার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবছর জামাইদের মিলনমেলা হিসেবে আয়োজন করেন বকচরের মেলা। এই এলাকার মানুষের রীতি জামাইদের বকচরের মেলায় দাওয়াত করে সম্মানিত করা। আর জামাইয়েরা এসে মেলার প্রধান আকর্ষণ বাহারি মাছ ও মিষ্টি কিনে মাটির হাঁড়িতে ভরে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যান। কার জামাই কত বেশি মেলার মাছ ও মিষ্টি কিনতে পারেন, তাই নিয়ে চলে তাঁদের মধ্যে প্রতিযোগিতা।

বগুড়া শহর থেকে মেলার পাশের গ্রামে শ্বশুরবাড়ির দাওয়াতে এসেছেন শামীম আহম্মেদ। তিনি বলেন, প্রতিবছরই মেলায় এসে বাহারি মাছ ও মাটির হাঁড়িতে মিষ্টি নিয়ে এলাকার রীতি অনুসারে শ্বশুরবাড়িতে যান। এবারও এসব কেনার জন্য মেলায় এসেছেন।

মেলায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নেমেছে। চলছে কেনাকাটার ধুম। মূল মেলার পরদিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার বসবে বউ মেলা। এ দিন এলাকার নারী ও গৃহবধূরা তাঁদের স্বামীদের নিয়ে মেলায় এসে বাহারি জিনিসপত্র কেনাকাটা করেন।

মেলার আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা যায়, মেলার সপ্তাহখানেক আগেই স্বজনদের দাওয়াত করা হয়। তাঁদের তালিকার শীর্ষে রাখা হয় নতুন জামাই। মেলার প্রধান আকর্ষণ থাকে মাছ ও মিষ্টি। তবে এর সঙ্গে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী কিনতে আসে দূর-দূরান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ। সব মিলে লাখো মানুষের পদভারে কম্পিত হয় ঐতিহ্যবাহী বকচরের মেলা। এ অঞ্চলের মেয়েরা মেলা উপলক্ষে তাঁদের স্বামীদের নিয়ে বাবার বাড়ি বেড়াতে আসেন। পরে মেলায় ওঠা বড় আকারের মাছ ও মিষ্টি জামাইয়েরা প্রতিযোগিতা করে কিনে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যান। সেই মাছ-মিষ্টি দিয়ে এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়িতে চলে জামাইদের আপ্যায়ন।

মেলার মাছ ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, এবারের মেলায় যমুনা নদী ও চলনবিলের বড় রুই, কাতলা, বোয়াল, শোল, আইড়, পাঙাশসহ নানা জাতের পুকুরে চাষ করা মাছ প্রচুর উঠেছে। মেলায় ৬-৮ কেজি ওজনের মাছের চাহিদা বেশি। ক্রেতাদের চাহিদা বুঝে মেলায় মাছ নিয়ে আসা হয়।

বুধবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকেই মেলামুখী হাজারো মানুষের ঢল। মেলায় যাওয়ার সব পথেই যানজট। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ঢল আরও বাড়তে থাকে। মেলার বেশির ভাগ স্থান মাছ ব্যবসায়ীদের দখলে। এর মধ্যে আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা আছেন। মেলায় রকমারি মিষ্টি, কাঠের বাহারি জিনিস ও শিশুদের খেলনার পসরা সাজানো হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার মহন্ত বলেন, করোনায় বিধিনিষেধ থাকায় সরকারিভাবে মেলার কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। মেলা বন্ধের জন্য পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া ছিল।

ধুনট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃপা সিন্ধু বালা বলেন, মঙ্গলবার রাতেই মেলার বেশ কিছু দোকান ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তারপরও মেলায় লাখো মানুষের উপস্থিতি ঠেকানো সম্ভব হয়নি।