শহরের উকিলপাড়া এলাকার মেসার্স রাহী ভ্যারাইটি স্টোরের মালিক মান্নাফ রাহী বলেন, ‘প্রতিদিন আমার দোকানে কমপক্ষে ৩০ লিটার বোতলজাত তেল বিক্রি হয়। অথচ চার-পাঁচ দিন ধরে পাইকারি দোকানদারদের কাছে তেলের অর্ডার দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় গত রোববার থেকে ক্রেতা এলেও তেল বিক্রি করতে পারছি না। ক্রেতারা তেল কিনতে এসে নিরাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু নওগাঁ শহরে নয়, জেলার অন্যান্য উপজেলায় একই পরিস্থিতি। জেলার সব বাজারে বোতলজাত তেল সহজে মিলছে না। খোলা তেল মিললেও বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে। প্রতি লিটার খোলা তেল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়।
সকাল ১০টার দিকে কথা হয় বাঙ্গাবাড়ীয়া এলাকার বউ বাজারের দোকানদার সাইদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার এখানে প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০ লিটার তেল বিক্রি হয়। অথচ আজ মাত্র আট লিটার তেল দোকানে তুলতে পেরেছি। দোকান খোলার এক ঘণ্টার মধ্যেই ২০০ টাকা লিটার দরে সেই তেল বিক্রি হয়ে গেছে। এখন ক্রেতারা এসে চাইলেও তেল দিতে পারছি না।’

সাইদুরের দোকানে তেল কিনতে এসে তেল না পেয়ে নিরাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন বাঙ্গাবাড়ীয়া স্লুইসগেট এলাকার বাসিন্দা হারুনুর রশিদ। তিনি বলেন, এটা আজব দেশ। হঠাৎ করে বাজার থেকে তেল উধাও হয়ে গেল, এটা কোনো কথা। প্রত্যেক ব্যবসায়ীর কাছে সয়াবিন তেল আছে। কিন্তু কেউ বিক্রি করছেন না। তেল মজুত রেখে মানুষকে জিম্মি করে তেলের দাম বাড়ানোর কৌশল শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা। প্রশাসনের উচিত এসব অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।

উকিলপাড়ার টিফিন টাইম রেস্টুরেন্টের মালিক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সয়াবিন তেলের দাম যা–ই হোক রেস্টুরেন্ট চালাতে গেলে তেল তো লাগবেই। অথচ দোকানে দোকানে ঘুরে দু-তিন দিন ধরেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আজ সকালে আমার এক পরিচিত দোকানির কাছ থেকে প্রতি লিটার ২০০ টাকা দরে পাঁচ লিটার খোলা তেল কিনেছি।’

ব্যবসায়ীদের একটি সূত্র জানায়, ঈদের আগে ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধির আশায় ব্যবসায়ীরা তেল বিক্রি না করে যাঁর কাছে যত বোতলজাত তেল আছে, তা দোকান থেকে সরিয়ে রেখেছেন। আবার বোতলের গায়ে দাম লেখা থাকায় অনেকে সেই তেল বিক্রি না করে বোতল খুলে লিটারপ্রতি ২০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। তাঁরা এই সুযোগে লিটারপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা বাড়তি লাভ করছেন। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ জনগণ।

শহরের পৌর বাজারের মেসার্স মৌমিতা পাল ভ্যারাইটি স্টোরের মালিক গোবিন্দ পাল বলেন, এক সপ্তাহ ধরে বোতলজাত তেলের সংকট চলছে। বোতলজাত তেল নিতে গেলে সরবরাহকারীরা শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন। এক কার্টনে এক লিটারের বোতলজাত তেলের ১৮টি বোতল থাকে। এক কার্টন তেল কিনতে হলে ৩ কেজি চা–পাতা কিংবা ১০ কেজি আটা কিনতে হবে। যেখানে তেল দরকার, সেখানে আটা কিংবা চা–পাতা নিয়ে কী করবেন? আর এত আটা ও চা–পাতা তো এই সময়ে খুচরা বিক্রি সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নওগাঁ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক শামীম আহমেদ বলেন, নওগাঁতে বোতলজাত তেল সংকটের বিষয়টি তাঁদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। কোনো ব্যবসায়ী মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন কি না, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে অবৈধ মজুতের প্রমাণ পেলে অভিযান চালিয়ে তাঁদের শাস্তি কিংবা জরিমানা করা হবে।

এ ধরনের সংকট তৈরি হওয়া খুবই দুশ্চিন্তার বিষয় বলে জানালেন জেলা প্রশাসক খালিদ মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, এ সমস্যার সমাধানে আজই নওগাঁর ভোজ্যতেল ডিলারদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। এ ছাড়া শহরের বিভিন্ন বাজারে খুচরা দোকানেও পরিদর্শন করা হবে। কোনো দোকানি যদি বাড়তি লাভের আশায় সয়াবিন তেল মজুত করেন, তাঁদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন