হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, খুলনা করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে মাসখানেক ধরে আক্রান্ত রোগীর চাপ সামলাতে সবাইকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এরই মধ্যে শহরে আরও দুটি সরকারি হাসপাতালে করোনা চিকিৎসা দেওয়া শুরু হয়েছে। তবু সেখানকার চাপ কমেনি। হাসপাতালে আসা বেশির ভাগেরই শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা থাকছে। কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন দিয়ে তাঁদের শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখা জরুরি হয়ে পড়ছে। এই হাসপাতালে আগে থেকেই একটি লিকুইড অক্সিজেন প্ল্যান্ট ছিল। মূলত অপারেশন থিয়েটারের জন্য সেখান থেকে অক্সিজেন ব্যবহার করা হতো। পরে সক্ষমতা বাড়িয়ে সেই প্ল্যান্ট থেকেই করোনা রোগীদের জন্য কেন্দ্রীয় সরবরাহ সচল রাখছে কর্তৃপক্ষ। এর পাশাপাশি সিলিন্ডার অক্সিজেন ব্যবহার করে কোনোমতে সামলে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এখন প্রতিদিন ৩০০টি ছোট, ২০টি মাঝারি এবং ৫টি বড় সিলিন্ডার লাগছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মো. রবিউল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিলিন্ডার বা অক্সিজেনের সংকট এখনো হয়নি। তবে ভয় পাচ্ছি। এখনো রোগী একটা পর্যায়ে আছে, যদি এটা বেড়ে যায়, তখন বিপদ হবে। শয্যা বাড়িয়ে আরও রোগীর সেবা দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের আছে। জনবল–সংকট তেমন নেই। আমরা ২০০ শয্যা করার চেষ্টা করছি। ২০০ শয্যা পুরোপুরি করলে রোগী ভর্তি থাকবে আরও অনেক বেশি। তখন সিলিন্ডার দিয়ে পারব না। নতুন অক্সিজেন প্ল্যান্ট চালু হলে আমরা শয্যা বাড়াতে পারতাম।’

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে আজ শুক্রবার সকাল পর্যন্ত এই হাসপাতালে ১১ জন মারা গেছেন। হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৯৫ জন। যার মধ্যে করোনা পজিটিভ রোগী ১২৬ জন, উপসর্গ নিয়ে ভর্তি ৩১ আর আইসিইউ ও এইচডিইউতে সমপরিমাণ ১৯ জন করে রোগী ভর্তি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও করোনা চিকিৎসায় যুক্ত চিকিৎসক-নার্সদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনার প্রথম দফায় ডেডিকেটেড হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগীর ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় সিলিন্ডার থেকে পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করা হতো। চাহিদা অনুযায়ী ওই সময় অনেককে প্রয়োজনের তুলনায় কম অক্সিজেন দিতে হয়েছে। এ কারণে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লিকুইড অক্সিজেন প্ল্যান্ট চালুর নির্দেশনা দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গত বছর ঢাকার বসুন্ধরার অস্থায়ী হাসপাতাল থেকে স্পেকট্রা কোম্পানির ট্যাংকটি খুলনায় আনা হয়। এরপর সেভাবেই কয়েক মাস পড়ে ছিল। পরে হাসপাতাল, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কয়েক দফা চিঠি চালাচালির পর মার্চ মাসে ট্যাংকটি স্থাপনের প্রশাসনিক অনুমোদন মেলে। এ বছরের জুনের মাঝামাঝি সময়ে ট্যাংকটি বসানো হয়। তারপর করোনা হাসপাতালের একটি কক্ষ ভ্যাকুয়াম রুম হিসেবে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। এরপর তরল অক্সিজেন সরবরাহের জন্য যে চুক্তির দরকার হচ্ছিল, ২ জুলাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্পেকট্রার সেই চুক্তিও হয়ে গেছে। তবে তরল অক্সিজেনের অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না।

হাসপাতালের পরিচালক মো. রবিউল হাসান বলেন, ‘অন্য সব ধরনের কাজ শেষ হলেও স্পেকট্রা ট্যাংকারে তরল অক্সিজেন সরবরাহ না করায় এখান থেকে অক্সিজেন ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তারা আজ দেব কাল দেব বলছে।’

করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের তত্ত্বাবধায়ক দিলীপ কুমার কুন্ডু প্রথম আলোকে বলেন, প্রচুর অক্সিজেন লাগছে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন খারাপ খারাপ রোগী। তাঁদের অক্সিজেন বেশি লাগে। আইসিইউ খালি থাকছে না। আইসিইউ দরকার, এমন রোগীর সংখ্যাও অনেক। সে জন্য অনেক হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা চলছে। আসলে এসব সিলিন্ডার দিয়ে হয় না। বর্তমানে যে ট্যাংক আছে, তাতে প্রায় প্রতিদিনই অক্সিজেন রিফিল করা লাগছে। রিফিলের জন্য যদি কখনো গাড়ি মিস হয়, তাহলে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। অন্য প্ল্যান্টটিও তাই দ্রুত চালু হওয়া দরকার।

স্পেকট্রা অক্সিজেন লিমিটেডের খুলনা অঞ্চলের ডিপো ইনচার্জ সজীব রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, এই অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় কিছু বড় ট্যাংক বসানো হয়েছে। যখন চুক্তি হয়, তখন মার্কেটে টোটাল লিকুইডের যে পরিমাণ ডিমান্ড ছিল, এখন সেটা আকাশ-পাতাল পার্থক্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুলনার অনেক হাসপাতালেই চাহিদা পাঁচ থেকে সাত গুণ বেড়েছে। বাসায়ও অক্সিজেনের চাহিদা অনেক বেড়েছে। খুমেক হাসপাতালে সিলিন্ডার যথাসাধ্য দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্ল্যান্টের ট্যাংকারেও তরল অক্সিজেন রিফিল করা হবে। হয়তো একটু দেরি হচ্ছে।