নৌকাগুলোর ইঞ্জিনের সঙ্গে যুক্ত থাকে দীর্ঘ পাইপ। নৌকা চলন্ত অবস্থায় ওই পাইপ দিয়ে পানির তলদেশ থেকে তোলা হয় বালু। সিলেট, ৩ সেপ্টেম্বর
নৌকাগুলোর ইঞ্জিনের সঙ্গে যুক্ত থাকে দীর্ঘ পাইপ। নৌকা চলন্ত অবস্থায় ওই পাইপ দিয়ে পানির তলদেশ থেকে তোলা হয় বালু। সিলেট, ৩ সেপ্টেম্বরপ্রথম আলো

দেখতে ইঞ্জিনচালিত নৌকার মতো। কিন্তু এ নৌকাগুলোর ইঞ্জিনের সঙ্গে যুক্ত থাকে দীর্ঘ পাইপ। নৌকা চলন্ত অবস্থায় ওই পাইপ দিয়ে পানির তলদেশ থেকে তোলা হয় বালু। সেই বালু নদীর মাঝখান থেকেই ‘বলগেট’ নামে বালুবাহী নৌযানে সরবরাহ করা হয় পাইপ দিয়ে।

বালু ও পাথর উত্তোলনে উচ্চ আদালত থেকে নিষিদ্ধ যন্ত্র ‘বোমা মেশিন’ নৌকায় স্থাপন করার এই কৌশল ব্যবহৃত হচ্ছিল সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদে। আজ বৃহস্পতিবার দিনভর উপজেলা প্রশাসন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে পরিচালিত টাস্কফোর্সের অভিযানে এ রকম ৩০টি নৌযান থেকে ‘বোমা মেশিন’ জব্দ করেছে। যন্ত্র পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে ৩০ বালুর কারবারিকে ৪৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন আচার্যের নেতৃত্বে এই অভিযান চালানো হয়। এর আগে আরও তিনটি অভিযানে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার জরিমানা করা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন
default-image

উপজেলা প্রশাসন জানায়, ধলাই নদের উৎসমুখের ‘সাদা পাথর’ এলাকা পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং চেরাপুঞ্জির পানির প্রবাহের একটি ঝরনা ধলাই নদে মিশেছে। ধলাই অববাহিকা এলাকা ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি। এই নদের তিনটি অংশ বালুমহাল হিসেবে ইজারা দেওয়া হয়। এবার দুটো অংশ বাদ দিয়ে একটি অংশ ইজারা দেওয়া হয়েছে। ইজারার শর্ত অনুযায়ী বালু উত্তোলনে কোনো ধরনের যন্ত্রের ব্যবহার করা যাবে না।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, কম শ্রমিক দিয়ে দ্রুত বেশি পরিমাণ বালু উত্তোলন করতে এক শ্রেণির কারবারি নানা কৌশলে যন্ত্রের ব্যবহার শুরু করেন। খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন চার দফায় অভিযান চালায়। এরপর প্রকাশ্যে যন্ত্রের ব্যবহার কমে।

টাস্কফোর্সের অভিযানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ধারাবাহিক এই অভিযানের মধ্যে বালুর কারবারিরা যন্ত্র ব্যবহারের কৌশল বদল করতে গিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ‘বোমা মেশিন’ ব্যবহার শুরু করেন। আজ বেলা ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত টাস্কফোর্সের অভিযান চলে। ধলাই নদের তীরে রজ্জুপথের (রোপওয়ে) সংরক্ষিত ‘বাংকার’ এলাকার আশপাশ এলাকাসহ ইজারাবহির্ভূত স্থানেও অভিযান চালানো হয়।

এর মধ্যে ধলাই নদের দক্ষিণে বালুমহাল এলাকা থেকে ১৩টি নৌকায় বোমা মেশিন ব্যবহার করায় নৌকামালিক ১৩ জনকে ২ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। ধলাই নদের উত্তরে ১৭টি নৌযান আটকের পর ১ লাখ টাকা করে ১৭ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। সব মিলিয়ে ৪৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে জব্দ করা মেশিনগুলো হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে নষ্ট করে দেওয়া হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, পানি উত্তোলন যন্ত্রকে (পাওয়ার পাম্প) রূপান্তর করে নাম দেওয়া হয়েছে ‘বোমা মেশিন’। মাটির প্রায় ৩০০ ফুট গভীর থেকে পাইপ দিয়ে পানি তোলার ছলে উত্তোলন করা হয় বালু ও সিঙ্গেল পাথর। এ নিয়ে ২০০৯ সালে উচ্চ আদালত এক নির্দেশনা জারি করলে পরিবেশ অধিদপ্তর বোমা মেশিন নিষিদ্ধ করে। এরপর থেকে উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় সিলেটের পাথর ও বালুমহাল এলাকাগুলোতে পরিবেশ ও প্রশাসনের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স নিয়মিত অভিযান চালিয়ে আসছে।

অভিযান শেষে ইউএনও সুমন আচার্য প্রথম আলোকে বলেন, শুষ্ক মৌসুমে পাথর কোয়ারি এলাকায় যেসব যন্ত্র স্থাপন করা হতো, সেসব যন্ত্র নানা রকম নাম দিয়ে বর্ষাকালে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত হচ্ছে। যন্ত্র চালানোর পেছনে সেই একই চক্র সক্রিয়। অভিযানে তাই শ্রমিকদের বাদ দিয়ে যন্ত্রমালিক বের করে জরিমানা করা হয়েছে। ধলাই নদে যন্ত্রের ব্যবহার বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত টাস্কফোর্সের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

কোম্পানীগঞ্জ থানা সূত্র জানায়, ৩০টি নৌযানের মালিকের মধ্যে ২১ জনের নাম বের করে জরিমানা করার বিষয়টি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে একজন কারবারি ঘটনাস্থলেই জরিমানার টাকা পরিশোধ করেছেন। বাকিদের জরিমানা আদায় প্রক্রিয়াধীন আছে। নৌযানমালিক কেউ জরিমানার টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে মামলা করা হবে।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন