default-image

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার আশুড়ার বিল–সংলগ্ন খাটাংপাড়া গ্রামের বাসিন্দা লালবানু। স্বামী-সন্তানসহ তাঁর পাঁচজনের পরিবার। আশুড়ার বিলে আট বিঘা জমিতে ধান আবাদ করে সংসার চলে তাঁদের। গত বছর বিলের মধ্যে আড়াআড়িভাবে বাঁধ নির্মাণ করায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

বাঁধ নির্মাণ করায় ব্যাহত হয় ধান চাষ। তাই সেখানে বাঁধ নির্মাণ না করার দাবিতে মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে ১০ দিন ধরে বাঁধের ওপরে অবস্থান করছেন লালবানু। সঙ্গে তাঁর স্বামী-সন্তানও রয়েছেন।

বিলে বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করে ধান আবাদ করার দাবিতে আশুড়ার বিলে অবস্থান করছেন প্রায় দেড় হাজার নারী-পুরুষ। তাঁদের সঙ্গে রয়েছে পরিবারের শিশু, কিশোর ও বৃদ্ধরা। তাঁরা ৩১ অক্টোবর থেকে এই কর্মসূচি শুরু করেন।

গতকাল সোমবার দুপুরে আশুড়ার বিলে গিয়ে দেখা যায়, বিলপাড়ে ৩টি শামিয়ানার নিচে বসে আছেন অনেক মানুষ। তাঁদের হাতে ব্যানার ও ফেস্টুন। অধিকাংশের মাথায় কাফনের কাপড় বাঁধা। মাঝেমধ্যে মাইকে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছর সেপ্টেম্বরে এই বিলপাড়ে বৃহত্তর বগুড়া ও দিনাজপুর জেলা ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করে। ওই সময় বিলপাড়ের কৃষকেরা আপত্তি জানান। তারপরও বিএডিসি কাজ অব্যাহত রাখে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাঁধ কেটে দেন স্থানীয় ব্যক্তিরা। পরে প্রশাসন বাঁধটি মেরামত করে। এ ঘটনায় স্থানীয় ২৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা তিন শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে একটি মামলা করা হয়। এবারের বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহে বাঁধটি ভেঙে যায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন সেখানে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন কৃষক জানান, বিলপাড়ে আদর্শ গ্রাম, কাইদারঘোনা, হরিপুর, খাটাংপাড়া, বাসটেক, খৈলসাগাড়িসহ ২২ গ্রামের মানুষের বসবাস। নবাবগঞ্জ, ফুলবাড়ি, বিরামপুর এলাকার প্রায় ২০ হাজার মানুষ বিলের ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়। বর্ষা মৌসুমে মাছ শিকার করা হয়। আড়াআড়ি বাঁধ দেওয়ার ফলে বিলে পানি জমে রয়েছে ৮-১০ ফুট। অনশন কর্মসূচির সপ্তম দিনে গত শুক্রবার বিলপাড়ের আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা গোলাপ সরকার (৭০) অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাড়িতে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

তীরদহ গ্রামের কৃষক রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সারা বছরের খাবার জোগান দেয় আশুড়ার বিল। বাঁধ নির্মাণের কারণে চাষাবাদ হুমকির মুখে। বাঁধ খুলে দেওয়ার দাবি জানানো হলেও প্রশাসন কোনো উদ্যোগ নেয়নি।’

আরেক কৃষক সাদেক আলী (৫৫) বলেন, ‘১০ দিন হয়ে গেল প্রশাসন আমাদের কথা পর্যন্ত শুনল না। এর আগেও জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি। উল্টো বাঁধ নির্মাণে বাধা দেওয়ায় মামলার বোঝা নিয়ে এলাকার মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে।’

এ সম্পর্কে বিএডিসির বগুড়া অঞ্চলের প্রকল্প পরিচালক এ এস এম শহীদুল আলম মুঠোফোনে বলেন, এ বছর বর্ষায় বাঁধটি ভেঙে গেছে। স্থানীয় সাংসদ ও ইউএনওর অনুরোধে তাঁরা ক্রস ড্যাম নির্মাণের কাজটি হাতে নিয়েছেন। এতে ব্যয় হবে ৩১ লাখ টাকা। খুব শিগগির সংস্কারকাজ শুরু হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে শহীদুল আলম জানান, বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ করা হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডকেও কিছু জানানো হয়নি।

ইউএনও নাজমুন নাহার বলেন, আশুড়ার বিল সরকারি জায়গা। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয় রয়েছে। এলাকাবাসী বিলের জমি দাবি করলেও তাঁরা কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। অনেকে বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছেন। সরকার তার প্রয়োজনে এখানে বাঁধ নির্মাণ করবে। এখানে মাছ চাষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্পে স্থানীয় ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0