default-image

দুর্গম পাহাড়ি টিলাবেষ্টিত ও আধুনিক সুবিধাবঞ্চিত সিলেট বিভাগের প্রত্যন্ত এলাকায় খাসিয়া সম্প্রদায়ের বসবাস। দেশে করোনা পরিস্থিতি শুরু হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় লকডাউন কার্যকর রেখেছে। ফলে সিলেট বিভাগের ৯০টি খাসিয়াপুঞ্জির ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পাহাড়ি গ্রামে এখনো কোনো কোভিড-১৯–এ আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়নি। করোনার এই মহামারিতেও তারা করোনা থেকে সুরক্ষিত রয়েছে।

পুঞ্জিবাসীদের অধিকার আদায়ের সংগঠন কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠন ও খাসি কাউন্সিলের তথ্যমতে, সিলেট বিভাগের চার জেলায় ৯০টি খাসিয়াপুঞ্জি রয়েছে। এসব পুঞ্জিতে জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। করোনা সংক্রমণ শুরু হলে খাসিয়াপুঞ্জিগুলোকে করোনামুক্ত রাখতে দিন–রাত মাঠে কাজ করেছেন খাসিয়া সম্প্রদায়ের নেতা–কর্মীরা। তাঁরা এক পুঞ্জি থেকে আরেক পুঞ্জি ঘুরে মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব ঠিক রাখা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করাসহ সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়েছেন এবং এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন। এখানে চাল ও ডাল বাইরে থেকে কিনে আনার পর তাতে জীবাণুনাশক স্প্রে করা হয়। এক সপ্তাহ পুঞ্জির প্রবেশপথের ফটকসংলগ্ন একটি বাড়িতে রাখা হয়, যাতে করোনাভাইরাস পুঞ্জিতে ছড়াতে না পারে।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ফ্লোরা বাবলি তালাং বলেন, খাসিয়াপুঞ্জির বেশির ভাগ মানুষ আধুনিক সুবিধাবঞ্চিত। নিজেদের সুরক্ষার জন্য তাঁরা কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেটের সহকারী পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, গত শনিবার পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট করোনা রোগী পাওয়া গেছে ৮ হাজার ৪৯৭ জন। তাঁদের মধ্যে মারা গেছেন ১৫৩ জন। কিন্তু খাসিয়াপুঞ্জিগুলোতে কেউ করোনায় সংক্রমিত হননি। তাঁরা ঠিকমতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় লকডাউনে থেকেছেন বলেই খাসিয়াপুঞ্জিগুলোতে কোনো করোনা রোগী পাওয়া যায়নি। পুঞ্জিতে যেভাবে লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা হয়, তা সবার জন্য অনুকরণীয়। যে কেউ উদাহরণ হিসেবে খাসিয়াপুঞ্জির ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে পারেন।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া খাসিয়াপুঞ্জির বাসিন্দা সাজু মারছিয়াং বলেন, লকডাউন বাস্তবায়নের বিষয়ে তাঁরা পুঞ্জির সবার সঙ্গে সভা করেছেন, যাতে কাউকে বিশেষ ছাড় না দেওয়া হয়। কোভিড-১৯ যদি খাসিয়াপুঞ্জিতে প্রবেশ করে, তাহলে সবাই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। একটু কষ্ট করে হলেও পুঞ্জিগুলোতে যাতে বাইরের লোকজন প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য সেখানে উৎপাদিত পান পুঞ্জির বাইরে একটি নির্দিষ্ট স্থানে পাইকারদের কাছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বিক্রি করা হচ্ছে। পানের ক্রেতারাও পুঞ্জির এসব নির্দেশনা মেনে চলেছেন।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার মেগাটিলা খাসিপুঞ্জির হেডম্যান (পুঞ্জিপ্রধান) মনিকা খংলা বলেন, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সতর্কতা হিসেবে বাইরে থেকে আনা চাল ও ডালের বস্তায় জীবাণুনাশক স্প্রে করে পুঞ্জির প্রবেশপথের ফটকসংলগ্ন একটি ঘরে এক সপ্তাহ রাখা হয়। পরে তা সরবরাহ করা হয়।

কমলগঞ্জের মাগুরছড়া খাসিয়াপুঞ্জির হেডম্যান ও বৃহত্তর খাসি কাউন্সিলের সভাপতি জিডিশন প্রধান সুছিয়াং বলেন, শুরু থেকে তাঁরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কড়া লকডাউনে আছেন। পুঞ্জির ভেতরেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছেন। এতে কারও করোনার উপসর্গ দেখা যায়নি এবং করোনা পরীক্ষার প্রয়োজনও পড়েনি।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশেকুল হক বলেন, কোভিড-১৯ বিষয়ে খাসিয়াপুঞ্জিবাসী অত্যন্ত সচেতন ও আন্তরিক। নিজস্ব কড়া নিয়মে তাঁরা করোনামুক্ত রয়েছেন। তাঁদের এ নিয়ম পুঞ্জির বাইরের জনগোষ্ঠী মেনে চললে তারাও করোনামুক্ত থাকত।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0