মুজিব বর্ষে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে অভিনব কর্মসূচির ভিড়ে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পাওয়া গেছে একটি নিরাপদ সবজি গ্রাম। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে এ গ্রামের অর্ধশতাধিক কৃষকের বসতবাড়িতে নিরাপদ সবজি চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম মুজিব বর্ষের উপহার হিসেবে গ্রামটি এভাবে গড়ার উদ্যোগ নেন। এই সবজি তাঁরা নিজেরা খাচ্ছেন এবং উদ্বৃত্তগুলো বিক্রিও করছেন।

default-image

গ্রামটির নাম কালীদীঘি। এটি গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নের। বরেন্দ্র অঞ্চলের খরাপীড়িত শুষ্ক মাটির এ গ্রামে বড় কোনো গাছপালা নেই। এখানে ফসল ফলানোই একটা চ্যালেঞ্জ।

শফিকুল ইসলাম জানান, মুজিব বর্ষে ব্যতিক্রমী কিছু করার চিন্তা থেকে তিনি এ গ্রামের কৃষকদের বাড়ির আনাচকানাচে নিরাপদ সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করেন। নিরাপদ সবজি বলতে এখানে কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা হয়নি। পোকা দমনে শুধু জৈব বালাইনাশক, সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ও হলুদ স্টিকি ফাঁদ ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া কৃষকদের কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। গত আড়াই থেকে তিন মাসে এ উদ্যোগ অনেকটা সফল হয়েছে।

শফিকুল ইসলাম বলেন, এ জন্য সরকারি তহবিল থেকে একটি টাকাও খরচ করা হয়নি। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা নিজের থেকে এটা করেছেন। এখন গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে এ সবজি চাষ হচ্ছে। তিনি মনে করেন, এখন অন্য গ্রামের কৃষকেরাও এটা অনুসরণ করবে।

গতকাল মঙ্গলবার কালীদীঘি গ্রামে গিয়ে প্রায় সব বাড়ির পাশেই কিছু না কিছু সবজিখেত দেখা যায়। প্রতিটি খেতেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে বিভিন্ন সবজির নামসহ সাইনবোর্ড দেওয়া রয়েছে। গ্রামের মধ্যে আছে একটি বড় সাইনবোর্ড। তাতে লেখা, ‘মুজিব বর্ষ উপলক্ষে নিরাপদ সবজি গ্রাম।’ সাইনবোর্ডের দুই কোনায় বঙ্গবন্ধুর দুটি ছবি রয়েছে। গ্রামকে নিরাপদ সবজির জন্য প্রস্তুত করতে কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তার উল্লেখ আছে সাইনবোর্ডটিতে। এর নিচে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গোদাগাড়ীর বিদিরপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলামের নাম ও মুঠোফোন নম্বর দেওয়া রয়েছে, যাতে যে কেউ যেকোনো সময় পরামর্শের জন্য তাঁকে কল করতে পারেন।

কিষানি আনোয়ারা বেগম (৪৫) তাঁর বাড়ির আঙিনায় পালং শাক, লাল শাক, বেগুন ও মরিচ চাষ করেছেন। ইতিমধ্যে বেগুন ও শাক নিজে খাচ্ছেন এবং প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ কেজি করে বেগুন বিক্রি করছেন। তাঁর খেতে মরিচ এখনো ধরেনি। তাঁর বাড়ির আঙিনায় রয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাইনবোর্ড। আনোয়ারা বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ ছাড়া তিনি অন্য কিছুই খেতে ব্যবহার করেননি।

আরেক কিষানি শাহীনুর বেগম বললেন, তাঁর স্বামী মারা গেছেন। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তাঁর ছেলে কলেজে পড়ার পাশাপাশি পাশের একটি কারখানায় কাজ করেন। এ অবস্থায় তিনি বাড়িতে সবজি চাষ করেছেন। শাহীনুর বলেন, কর্মকর্তাদের পরামর্শে শুধুই ছাই ব্যবহার করে শিমের পোকা দমন করেছেন তিনি। পাশেই তাঁর মেয়ের বাড়ি। সেই বাড়িতে সদস্য কম। নিজেরা খেয়ে তাঁর মেয়ে এক মণ শিম বিক্রি করেছেন।

আবদুর রউফের স্ত্রী বিরজা বেগম খেতে বাঁধাকপি, পেঁয়াজ, বেগুন, লাউ, মিষ্টিকুমড়া ও পটল চাষ করেছেন। তিনি বলেন, তাঁদের কোনো সবজি কিনতে হয় না। পোকার খুব আক্রমণ হলে একবার হালকা করে ওষুধ ছিটান। কর্মকর্তাদের পরামর্শে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করেছেন। খুব ভালো সবজি হয়েছে।

ভ্যানচালক জোগেশ্বরের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তাঁর বাড়ির গাছে পেঁপে পেকে রয়েছে। তাঁর বাড়িতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পেঁপে বাগানের একটি সাইনবোর্ডও দেওয়া রয়েছে। তাঁর স্ত্রী নিয়তি রানী গাছ থেকে পাকা পেঁপে কেটে বলেন, তাঁর পেঁপে না খেলে তিনি ভীষণ মন খারাপ করবেন। নিয়তি রানীর ছোট্ট বাগানে পেঁপে ছাড়াও রয়েছে বেগুন, মিষ্টিকুমড়া ও লাল শাক।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামছুল হক বলেন, গোদাগাড়ীতে নিরাপদ সবজি গ্রামের বিষয়টি তাঁর জানা আছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0