বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নির্বাচনী সহিংসতায় মারা যাওয়া অখিল সরকার ইটভাটায় কাজ করতেন। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার সারুটিয়া ইউনিয়নের ভোটার নন তিনি। থাকতেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের শ্বশুরবাড়িতে। নিজ বাড়ি ঢাকার ধামরাই উপজেলায়। হারান আলীও থাকতেন কাঁচেরকোল বাজারের পাশে একই আশ্রয়ণ প্রকল্পে। তাঁরা আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সমর্থক ছিলেন।

গত ৩১ ডিসেম্বর ইউনিয়নের কাতলাগাড়ি বাজারে নৌকার প্রার্থীর নির্বাচনী কার্যালয়ে প্রতিপক্ষের হামলায় অখিল সরকার ও হারান আলী গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই হারান আলী মারা যান। তিনিও কৃষিশ্রমিক ছিলেন। আর অখিল সরকার ৫ জানুয়ারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

সারুটিয়া ইউনিয়নের নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত আরেকজন জসিম উদ্দিন। তিনিও দীর্ঘদিন ঢাকায় থাকতেন, ঘটনার দিন সকালে বাড়িতে এসেছিলেন। প্রতিপক্ষের লোকজন ভেবেছিলেন, নির্বাচনে ভোট দিতে বাড়িতে এসেছে, তাই তাঁকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। তাঁর বাড়ি  ভাটবাড়িয়া গ্রামে। তিনি ঢাকার একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক ছিলেন।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, সারুটিয়া ইউনিয়নের কাঁচেরকোল বাজারের পাশের গ্রামগুলোয় পৃথক কয়েকটি ঘটনায় নৌকা প্রতীকের তিন সমর্থক খুন হওয়ার পাশাপাশি আরও চারজন আহত হয়েছেন। তাঁরা কেউ রাজশাহীতে, আবার কেউ কুষ্টিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের একজন আবদুর রহিমের (৫২) অবস্থা খুবই গুরুতর। চিকিৎসকেরা ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন, যেকোনো সময় একটা কিছু ঘটে যেতে পারে।

উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার ৬ নম্বর সারুটিয়া ইউনিয়নে ৫ জানুয়ারি ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে চারজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান। নির্বাচনে তাঁর সঙ্গে শৈলকুপা উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জুলফিকার কায়সার টিপুর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়।

মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকেই নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান ও বিদ্রোহী প্রার্থী জুলফিকারের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। এ বিষয়ে আজিবর রহমান নামে স্থানীয় এক ভোটার জানান, নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মাহমুদুল হক মনোনয়ন নিয়ে ৭ ডিসেম্বর এলাকায় আসেন। ওই দিন মোটরসাইকেলের একটি মহড়া ছিল। কাঁচেরকোল বাজারে এসে বসার পর কিছু লোক চলে যান। বাকি কিছু লোক দলীয় কার্যালয়ে বসে ছিলেন। এ সময় প্রতিপক্ষ জুলফিকারের লোকজন সেখানে এসে হামলা চালান। ওই হামলায় আবদুর রহিম গুরুতর আহত হন। আরও চারজন আহত হয়ে হাসপাতালে যান।

আজিবর রহমান আরও জানান, উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চললেও নির্বাচনের প্রচারণার প্রথম দিকে বড় কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় হঠাৎ করে সন্ত্রাসীদের একটি দল নৌকার প্রার্থীর নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা চালায়। তারা সেখানে বসে থাকা মানুষদের কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নেওয়ার পর হারান আলী মারা যান। অন্যদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। এই ঘটনার পরদিন পাশের ভাটবাড়িয়া গ্রামের জসিম উদ্দিন ও মিলন ঢাকা থেকে বাড়িতে আসেন। সন্ত্রাসীদের দল তাঁদের ওপরও হামলা চালান। এতে জসিম উদ্দিন মারা যান ও মিলন আহত হন।

কাতলাগাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা দীলিপ সরকার জানান, তাঁদের এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৯০টি পরিবার বাস করে। এদের মধ্যে অধিকাংশই দরিদ্র। এক দিন কাজ না করলে তাদের খাবার জোটে না। এসব পরিবারের সদস্যরা কেউ ইটভাটায়, কেউ রাস্তায় মাটি কাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। এদের রাজনীতি করার সুযোগ নেই। তবে ভোটের সময় সবাই আনন্দ করেন। প্রার্থীদের নির্বাচনী কার্যালয়ে ঘুরে বেড়ান। নির্বাচনী প্রচারণা দেখতে গিয়ে এই আশ্রয়ণ প্রকল্পেরই দুইজন প্রাণ দিলেন।

দীলিপ সরকার আরও বলেন, পরিবারের প্রধান ব্যক্তি মারা যাওয়ায় পরিবারের অন্য সদস্যরা কীভাবে সংসার চালাবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
নির্বাচনী সহিংসতায় মারা যাওয়া অখিল সরকারের স্ত্রী বাসন্তী সরকার জানান, হাসপাতালে বসে তিনি তাঁর স্বামীকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করেছেন। নিজে খাবার না খেয়ে স্বামীর ওষুধ কিনেছেন। তারপরও স্বামীকে বাঁচাতে পারেননি। এখন তিনি অসহায় হয়ে পড়লেন।

নির্বাচনী সহিংসতায় মারা যাওয়া হারান আলীর স্ত্রী সুফিয়া বেগম জানান, তাঁর স্বামীও কোনো দিন রাজনীতি করেননি। রাজনীতি কী, তা–ও বুঝতেন না। শুধু নির্বাচনী প্রচার–প্রচারণা দেখতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। সেখানেই তাঁকে প্রতিপক্ষের লোকজন কুপিয়ে হত্যা করেছেন।

এ বিষয়ে সারুটিয়া ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ী চেয়ারম্যান প্রার্থী মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘তাঁরা নির্বাচন বানচাল করতে সন্ত্রাস করে জয়লাভ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জনগণ সেটা হতে দেয়নি। জনগণ সন্ত্রাসী তৎপরতার পাল্টা জবাব ভোটের মাধ্যমে দিয়েছেন।’ তিনি বলেন, নির্বাচনী সহিংসতায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে তিনি যতটুকু সম্ভব সহায়তা করবেন।

নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর সমর্থকদের ওপর হামলা চালানোর অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জুলফিকার কায়সার জানান, ঘটনাগুলোর সঙ্গে তাঁদের জড়িত করা হচ্ছে। এগুলো  একধরনের চক্রান্ত। এসব ঘটনা পুঁজি করে তাঁদের নির্বাচনের মাঠছাড়া করা হয়েছে। এখন তাঁদের নামে মামলা করে হয়রানি করা হচ্ছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন