জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের পাশে এক একর জমির ওপর জনসেবা চত্বরের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। জনপ্রশাসনের যেসব সদস্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের স্মরণে এ চত্বর নির্মাণ করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের দৃষ্টি ম্যুরাল–সংবলিত মুক্তমঞ্চ থাকবে এই চত্বরে। মুক্তমঞ্চটির নামকরণ করা হবে মুক্তিযুদ্ধে জনপ্রশাসনের প্রথম শহীদ তৎকালীন জেলা প্রশাসক এ কে এম শামসুল হক খানের নামে।

শহীদ এ কে এম শামসুল হক খান টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার আগতাড়াইল গ্রামের সন্তান। ১৯৩৪ সালে তিনি এ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মো. হাসান খান ছিলেন অবিভক্ত ভারতের পুলিশ কর্মকর্তা। মা মাসুদা খান ছিলেন গৃহিণী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে ভূগোলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। কিছুদিন রাজশাহী কলেজে শিক্ষকতা করেন। পরে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। ১৯৭১ সালে শামসুল হক কুমিল্লার জেলা প্রশাসক ছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে রেশন ও পেট্রোল সরবরাহ বন্ধ করেছিলেন। পুলিশের অস্ত্র–গোলাবারুদের গুদামের চাবি তাঁর অনুমোদন ছাড়া কারও হাতে না দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। পুলিশ সুপার মুন্সি কবির উদ্দিনের কাছে কুমিল্লা সেনানিবাসের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শফি চাবি চেয়েছিলেন। তখন তাঁকে চাবি দেওয়া হয়নি। পুলিশ সুপার জানিয়ে দেন, জেলা প্রশাসক নিষেধ করেছেন। তিনি চাবি দিতে পারবেন না।

এতে ক্ষিপ্ত হয় পাকিস্তানি বাহিনী। কুমিল্লা সার্কিট হাউস থেকে তারা শামসুল হক খান ও পুলিশ সুপারকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর শামসুল হকের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

শামসুল হকের ছোট ভাই এ কে এম ফজল উল হক খান চিকিৎসক। বড় ভাইকে নিয়ে তাঁর স্মৃতিচারণামূলক একটি লেখা আছে ‘স্মৃতি : ১৯৭১’ গ্রন্থে। রশীদ হায়দারের সম্পাদনায় বইটি প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি।

শামসুল হক খান এসপি মুন্সি কবির উদ্দিন এবং অন্যদের নিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে একটি অবরোধের নকশা করেছিলেন। কুমিল্লায় সেনাবাহিনীর রেশন ও পেট্রোল বন্ধ করে দেওয়া এবং ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শফিকে পুলিশের অস্ত্রাগারের চাবি না দেওয়ার ঘটনার কথা সে সময় খুব আলোচিত হয়েছিল। ফজল উল হক খান লিখেছেন, ‘এ সম্বন্ধে অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের লন্ডনের সানডে টাইমসে ১৩ জুন ১৯৭১ পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যা ও উপরিউক্ত বিষয়ে প্রতিবেদন ছিল।

এই চত্বরে প্রবেশের দুটি তোরণ একটি নামকরণ করা হচ্ছে, খন্দকার আসাদুজ্জামান নামে। খন্দকার আসাদুজ্জামান টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার নারুচী গ্রামের সন্তান। তিনি ১৯৩৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার আগে তিনি রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ছিলেন। নিজ জেলা টাঙ্গাইলে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। পরে ভারতে গিয়ে মুজিবনগর সরকারের অর্থসচিবের দায়িত্ব পান। সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর আওয়ামী লীগের যোগদান করেন। ১৯৯৬, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে টাঙ্গাইল-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ২০২০ সালের ২৫ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।

অপর তোরণের নামকরণ করা হচ্ছে তৌফিক–ই–এলাহী চৌধুরীর নামে। তিনি ছিলেন স্বাধীনতার পর টাঙ্গাইলের প্রথম জেলা প্রশাসক। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব ও সাহসিকতাপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি বীর বিক্রম খেতাব লাভ করেন।

৫ জুলাই জেলা প্রশাসক মো. আতাউল গনি এই চত্বরের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। এর আগে গত ২৪ জুন মুক্তমঞ্চের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান খান।

জেলা প্রশাসক মো. আতাউল গনি জানান, মেঘনা গ্রুপের আর্থিক সহায়তায় এই মুক্তমঞ্চ নির্মাণ করা হচ্ছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান মেনন ওরফে রাসেল বলেন, শামসুল হক এ দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। নিজ জেলায় তাঁর নামে মুক্তমঞ্চ করার মধ্য দিয়ে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের যে উদোগ নেওয়া হয়েছে, তা খুবই প্রশংসনীয়। এর মধ্য আগামী প্রজন্ম শামসুল হকের ত্যাগ ও বীরত্বের কথা জানতে পারবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন