default-image

দীপক, দীপঙ্কর ও শুভ তিন ভাই। নবম শ্রেণির পর দীপক আর লেখাপড়া করতে পারেনি। বাবার সঙ্গে নৌকা তৈরির কাজে যুক্ত হয়েছে সে। শুভ পড়ে অষ্টম শ্রেণিতে, দীপঙ্কর নবমে। করোনার কারণে এখন বিদ্যালয় বন্ধ। তারাও এখন নৌকা তৈরির কাজে বাবাকে সাহায্য করছে।

তিন ভাইয়ের বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার কিসমত রামপুর গ্রামে। বাবা নিরাথ চন্দ্র গাইন পেশায় কাঠমিস্ত্রি। মা কাজল রানী গৃহিণী। ছোট একটি বাড়ি ছাড়া সহায়সম্পত্তি বলতে তাঁদের কিছু নেই। শুকনা মৌসুমে কাঠের কাজ আর বর্ষায় নৌকা তৈরি করে জীবিকার সংস্থান হয়।

শুধু নিরাথ চন্দ্র নন, এই গ্রামের আরও অনেক পরিবার শুকনা মৌসুমে কাঠমিস্ত্রি ও বর্ষায় নৌকা তৈরির কাজ করে জীবিকা চালায়। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ছেলে দীপককে সঙ্গে নিয়ে নৌকা তৈরির কাজ করছেন নিরাথ। তাঁদের কাজে সাহায্য করছে দীপঙ্কর ও শুভ।

দীপক বলে, ‘দীপঙ্কর ও শুভ ভিকাখালী ইউনাইটেড মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। করোনার কারণে মার্চ থেকে বিদ্যালয় বন্ধ। কবে খুলবে, ঠিক নেই। তাই আমাদের সঙ্গে নৌকা তৈরির কাজে ওরাও দিন–রাত পরিশ্রম করছে।’

নিরাথ চন্দ্র গাইন বলেন, ‘আমরা মূলত কাঠমিস্ত্রি। শুকনা মৌসুমে গ্রামে কাঠের ঘর তোলার কাজ করি, আর বর্ষাকালে নৌকা তৈরি করে বাজারে বিক্রি করি। আমার পূর্বপুরুষেরাও নৌকা তৈরি করতেন। বৈশাখ থেকে আশ্বিন পর্যন্ত ছয় মাস এলাকায় ছোট ডিঙির বেশ চাহিদা থাকে। ৫ থেকে ৭ ফুট চওড়া এবং ১০ থেকে ১২ ফুট দৈর্ঘ্যের নৌকার কদর বেশি। গ্রাম ঘুরে ঘুরে নৌকা তৈরির জন্য গাছ কিনে করাতকলে চেরাই করে এনে নৌকা তৈরি করা হয়। প্রতিটি নৌকা আকারভেদে দুই থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হয়।’

নিরাথের বাড়ির একটু সামনেই শ্রীমন্ত নদ। এই নদের পাশের সড়কে ২০টি পরিবারের বসবাস। প্রতিটি বাড়িতেই নৌকা তৈরির কাজ চলতে দেখা যায়। এ যেন নৌকা তৈরির প্রতিযোগিতা চলছে। কারও যেন কথা বলার ফুরসত নেই। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কথা হয় লক্ষ্মণ গাইন, কালু গাইন, মিহির গাইন, নিরঞ্জন গাইন, ভরত গাইন, কালাম হাওলাদার, লালচান মিস্ত্রি ও আবদুল জলিলের সঙ্গে।

এই নৌকার কারিগরেরা জানান, দিন–রাত পরিশ্রম করে সপ্তাহে একটি পরিবার ৮ থেকে ১০টি নৌকা তৈরি করতে পারে। শনি থেকে বুধবার পর্যন্ত বিরামহীনভাবে চলে নৌকা তৈরির কাজ। বৃহস্পতিবার নৌকাগুলো একসঙ্গে বেঁধে নদে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় পাশে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কালীগঞ্জ হাটে। সেখানে মির্জাগঞ্জ, নলছিটি, দুমকি, বাউফলসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্রেতারা এসে নৌকা কিনে নিয়ে যান। এ সময় বাজারে নৌকার বেশ চাহিদা থাকায় দু–তিন ঘণ্টার মধ্যেই সব নৌকা বেচাকেনা শেষ হয়। আর্থিক সংকট থাকায় নৌকার বেশির ভাগ কারিগরেরা বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে গাছসহ নৌকা তৈরির সরঞ্জাম কিনে থাকেন। সরকার অল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করলে তাঁদের উপকার হতো।

মাধবখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনিরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, কিসমত রামপুর গ্রামে বেশ কয়েকটি পরিবার নৌকা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে। গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ মাছ চাষ ও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বর্ষার মৌসুমে পাকা বোরো ও ইরি ধান নৌকা ছাড়া কেটে আনা সম্ভব নয়। তাই এ সময় সবার নৌকার প্রয়োজন হয়। নৌকা তৈরির ক্ষুদ্র শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন