পাটগ্রামে পাথরভাঙা যন্ত্রে দুর্বিষহ জীবন

বিজ্ঞাপন

অনেক দূর থেকে আকাশের দিকে তাকালে দেখা যায় ধুলার কুণ্ডলী। সেই ধুলার উৎস খুঁজতে কিছু দূর এগিয়ে গেলেই আসতে থাকে প্রচণ্ড শব্দ। যত সামনে এগোনো যায় শব্দের মাত্রা বেড়ে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে। কাছে এলে বোঝা যায়, পাথর ভাঙার যন্ত্র এই ধুলার উৎস। ধুলার মধ্যে থাকা ছোট ছোট পাথরের কণা ঢুকে পড়ায় হাত দিয়ে নাক-মুখ চেপে রাখতে হয়। উচ্চ শব্দ আর ধোঁয়ায় দুর্বিষহ এই জীবন বুড়িমারী ইউনিয়নের বাসিন্দাদের। 

গতকাল শনিবার লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়নে গিয়ে এই চিত্র দেখা গেছে। ইউনিয়নের লালমনিরহাট-বুড়িমারী স্থলবন্দর মহাসড়ক এবং আঞ্চলিক সড়কের পাঁচ কিলোমিটারে পাঁচ শতাধিক পাথর ভাঙার যন্ত্র। এগুলো হাটবাজার, জনবসতিপূর্ণ এলাকা এমনকি বিদ্যালয়ের আশপাশে। ৫ থেকে ২০ হাত পর পর এগুলো স্থাপন করা হয়েছে। এসব যন্ত্র থেকে বের হওয়া পাথরের গুঁড়া শরীরে ঢুকে পাথর ভাঙার শ্রমিকেরা শ্বাসকষ্টসহ সিলিকোসিসসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সিলিকোসিস ফুসফুসের একধরনের মারাত্মক রোগ। যেসব শ্রমিক পাথর কাটা, ভাঙা ও গুঁড়া করার কাজ করেন, তাঁরা সিলিকোসিসে আক্রান্ত হন। মানুষের ফুসফুসে একটা সহজাত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে। সাধারণত ধুলিকণা বা অন্য কোনো পদার্থ ঢুকলে সেটি এসব পদার্থকে ধ্বংস করে ফেলে। কিন্তু পাথরে থাকা সিলিকন ক্রিস্টাল বা সিলিকন ডাই-অক্সাইডকে ফুসফুসের ওই আবরণ ধ্বংস করতে পারে না। ফলে এটি ফুসফুসের ওপর জমতে থাকে। এভাবে জমতে জমতে ফুসফুসে সিলিকোসিস রোগের সৃষ্টি হয়। 

default-image

 পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হাসনাত ইউসুফ বলেন, পাথর ভাঙার যন্ত্র থেকে বের হয়ে আসা ধুলা নাকমুখ দিয়ে শরীরে ঢুকে শ্বাসকষ্ট, এলার্জি, কাশি, ফুসফুসে প্রদাহ, যক্ষ্মা, সিলিকোসিসসহ নানা জটিল রোগের সৃষ্টি করে। তাই এ ধরনের রোগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এলে তাঁদের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। 

ইউনিয়নের শ্রীরামপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা আইয়ুব আলী সরকার বলেন, এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৪৫ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। তাঁদের মধ্যে ৩৫-৪০ জনই পাথরের কণার কারণে হওয়া শ্বাসকষ্ট ও কাশিতে আক্রান্ত হয়ে এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। 

বুড়িমারী স্থলবন্দরের কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, এই স্থলবন্দর দিয়ে ভারত ও ভুটান থেকে চুনাপাথর, কোয়ার্টজ, গ্রিন বোল্ডার, স্টোন বোল্ডার, গ্রানাইটসহ বিভিন্ন পাথর আমদানি করা হয়। স্থলবন্দর এলাকায় ২০০১ সালে এসব পাথর ভাঙার কাজ শুরু হয়। প্রথম দিকে ভবন বা টিনের ঘরের মধ্যে চুনাপাথর ও কোয়ার্টজ ভাঙা হতো। পরে ২০১০ সালের দিকে খোলা আকাশের নিচে পাথর ভাঙা শুরু হয়। পাটগ্রাম ছাড়াও সিলেটের সদর, জাফলং ও নারায়ণগঞ্জের সদর, সিদ্ধিরগঞ্জ এবং পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় পাথর ভাঙার যন্ত্র আছে। 

পাথর ভাঙার যন্ত্রের কারণে পাটগ্রামে বুড়িমারী ইউনিয়নের বেশির ভাগ মানুষই দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। এ বিষয়ে বুড়িমারী স্থলবন্দর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, পাথর ভাঙার যন্ত্রের শব্দ এবং ধুলায় ইউনিয়নের ২৫ হাজার মানুষই ঝুঁকিতে আছে। এর মধ্যে ৩ হাজার শিক্ষার্থী আছে। তবে চরম ঝুঁকিতে পাথর ভাঙার কাজে নিয়োজিত ১০ হাজার শ্রমিক। এসব শ্রমিকের পাশাপাশি পাথর পরিবহনের কাজে জড়িত প্রায় ৫ হাজার ট্রাকচালক ও তাঁদের সহকারীরা ঝুঁকিতে আছেন। 

default-image

বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবু সাইদ নেওয়াজ বলেন, গত ১৩ বছরে সিলিকোসিসে আক্রান্ত হয়ে ৬০ জন পাথর ভাঙা শ্রমিক মারা গেছেন। বর্তমানে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৩০ জন। এর মধ্যে ২০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। 

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, অবস্থা শোচনীয় হওয়ার পরও জেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এসব অবৈধ পাথর ভাঙার মেশিনের মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। 

 তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে পরিবেশ অধিদপ্তরের রংপুর কার্যালয়ের সাবেক উপপরিচালক মেজবাবুল আলম বলেন, বুড়িমারী স্থলবন্দর এলাকার মাত্র একজন পাথর ভাঙার যন্ত্রের মালিক পরিবেশের ছাড়পত্র নিয়েছেন। নীতিমালা অনুযায়ী আবেদন না করায় বাকিদের পরিবেশের ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় সেখানে মেশিন উচ্ছেদসহ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। 

পাথর ভাঙার মেশিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দায়িত্বে থাকা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক কুমার শর্মা বলেন, গত চার মাসে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে ২০টি পাথর ভাঙার মেশিন উচ্ছেদ করেন। পর্যায়ক্রমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অন্যান্য পাথর ভাঙার যন্ত্রও উচ্ছেদ করা হবে। 

default-image

জনবসতির আশপাশে

সরেজমিনে দেখা গেছে, লালমনিরহাট-বুড়িমারী স্থলবন্দর মহাসড়কের পাশে গুড়িয়াটারী গ্রামে শতাধিক পাথর ভাঙার যন্ত্র দিয়ে পাথর ভাঙা হচ্ছে। যন্ত্রের বিকট শব্দে কাঁপছে চারপাশ। প্রতিটি যন্ত্রে ১০-১২ জন শ্রমিক কাজ করছেন। তাঁরা বড় পাথর যন্ত্রের এক প্রান্তে ফেলছেন। যন্ত্রের আরেক প্রান্ত দিয়ে ওই পাথরের গুঁড়া বের হচ্ছে। পাথরের গুঁড়ার সঙ্গে ধুলা বেরিয়ে বাতাসে উড়ে সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে।

ওই সড়কের পাশেই নজরুল ইসলামের (৫৫) বাড়ি। তাঁর বাড়ির সামনে মাত্র সাত-আট গজের মধ্যে তিন পাশে পাথর ভাঙার যন্ত্র বসানো হয়েছে।

এই যন্ত্রের শব্দ ও ধুলায় দিন-রাত যন্ত্রণায় আছেন তাঁরা। তিনি বলেন, ‘রাতে তো ভারতের গাড়ি থেকে পাথর নামানোর ধুপধাপ শব্দে ঘুমানো যায় না। আর দিনে তো মেশিনের (যন্ত্র) ধুলা আর শব্দের কারণে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখি। যন্ত্রের শব্দে ঘরে ভেতরে একজনে ডাকলে আরেকজন তা শুনতে পায় না।’ 

কলাবাগান গ্রামের তুলিয়া খাতুনের বাড়ির কাছে পাথর রাখার একটি মাঠ আছে। সেই মাঠে প্রায় ২০টি যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। তুলিয়া খাতুন বলেন, ‘কী কন বাহে, মেশিনের যন্ত্রণায় হামারলার বাঁচা দায় যে। এই মেশিন থাকি হামাক কাহো বাঁচায় না। হামরা যে বাড়িত থাকির পাই না।’ 

সরেজমিনে দেখা গেছে, জনবসতির ২০ গজের মধ্যে মেসার্স জয় ট্রেডার্স নামের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাথর ভাঙার যন্ত্র রয়েছে। এর মালিক মো. আরিফুল হোসেন। পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আরিফুল হোসেন বলেন, তিনি এখনো পরিবেশের ছাড়পত্র নেননি। ধুলাবালু নিয়ন্ত্রণে তাঁরা নিয়মিত পানি ছিটিয়ে থাকেন। পাথর ভাঙার যন্ত্রের কারণে শুধু শ্রমিকেরাই নন, মালিক ও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে। 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে পাথর ভাঙার যন্ত্র

আবাসিক এলাকা এবং সড়কের দুই পাশের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘেঁষেও পাথর ভাঙার যন্ত্র রয়েছে। বুড়িমারী হাসর উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়, বুড়িমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গন্থবন্ধন শিশুনিকেতন, সফিয়ার রহমান রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল, বুড়িমারী আলিম মাদ্রাসা, উফারমারা হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উফারমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিমুতলা মহিলা হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও শিমুতলা হাফিজিয়া মাদ্রাসার আশপাশে পাথর ভাঙার যন্ত্র রয়েছে।

লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কের পাশে স্কুলপাড়া গ্রাম। ওই গ্রামে পাশাপাশি বুড়িমারী ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বুড়িমারী হাসর উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়। এসব বিদ্যালয়ের দুপাশ দিয়ে দুটি সড়ক গেছে। সড়কগুলোর পাশে একাধিক পাথর রাখার মাঠ। এসব মাঠে ২৫-৪০টি পাথর ভাঙার যন্ত্র বসানো হয়েছে।

এসব যন্ত্রের কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলোর বিষয়ে বুড়িমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাহেলা সুলতানা বলেন, তাঁর বিদ্যালয়ে ৪৪৪ জন ছাত্রছাত্রী। প্রতিদিন অসুস্থতার জন্য গড়ে উপস্থিতি ৩৭০ থেকে ৩৯৪ জন। বিদ্যালয় থেকে ৫০ গজ দূরে পাথর ভাঙা হচ্ছে। এতে শব্দ ও ধুলার কারণে দরজা-জানালা বন্ধ রেখে পাঠদান করতে হচ্ছে।

default-image

পাথর ভাঙা লাভজনক ব্যবসা

সম্প্রতি বুড়িমারী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বেশির ভাগ মালিককে খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এসব যন্ত্রের অধিকাংশ মালিক ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছেন। তাঁরা স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জমি ভাড়া নিয়ে এখানে যন্ত্র বসিয়েছেন। স্থানীয় কিছু ব্যক্তিও পাথর ভাঙার যন্ত্র বসিয়েছেন। এঁদের মধ্যে কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বেশি লাভের আশায় তাঁরা পাথর ভাঙার যন্ত্র বসিয়েছেন। 

 জেলার বাইরে থেকে এসে পাথরের ব্যবসা করার কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলা ও স্থানীয় যন্ত্রের মালিকেরা প্রথম দিকে ভারত থেকে ছোট ও বড় পাথর বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি করেন। এসব পাথর ভাঙার জন্য তাঁরা স্থলবন্দরের কাছে মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক ও বাড়ির পাশে স্থানীয় লোকজনের পতিত ও আবাদি জমিতে পাথর ভাঙার যন্ত্র বসান। কারণ, এখানে ভাঙলে দূরে কোথাও নিয়ে এই কাজ করতে পরিবহন খরচ করতে হয় না। জমির মালিকদের তাঁরা সারা বছরে আবাদের ফলনের হিসাব করে ১০ থেকে ১২ গুণ টাকা দেন। কারণ, আমদানি করা বড় পাথর বিক্রির চেয়ে ভাঙা পাথর বিক্রিতে লাভ বেশি। একটি পাথর ভাঙা যন্ত্রে প্রতিদিন ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ঘনফুট পাথর ভাঙা যায়। এতে ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক কাজ করেন। একজন শ্রমিক প্রতিদিন ৩৫০ টাকা পান। আর মেশিন চালানোর জন্য ৩ হাজার টাকার তেল খরচ হয়। সব খরচ দিয়ে প্রতিদিন একজন মেশিন মালিকের লাভ হয় ৪ হাজার টাকা।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুর আলম জানান, বুড়িমারী ইউনিয়নে ২ হাজার ৫৭৮ হেক্টর জমি রয়েছে। এর মধ্যে আবাদি জমির পরিমাণ ২ হাজার ১৫০ হেক্টর। প্রায় ৪০ হেক্টর জমিতে পাথর ভাঙার মেশিন বসানোর কারণে আবাদ হচ্ছে না। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এর চেয়ে দ্বিগুণ জমিতে পাথর রাখা এবং মেশিন বসানো হয়েছে। 

 এই বিষয়ে বুড়িমারী ইউপি চেয়ারম্যান আবু সাইদ নেওয়াজ বলেন, পাথর ভাঙার যন্ত্র থেকে ধুলা ছড়িয়ে পড়া এবং এই যন্ত্রের অসহনীয় শব্দ বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসক ও ইউএনওর কাছে আবেদন জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন:

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন