গভীর গর্তে জমা পানি নীল আকার ধারণ করেছে। গর্তের পাশে টিলা কাটা মাটির স্তূপ ঢিবির মতো। সোমবার দুপুরে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শাহ আরেফিন টিলায়
গভীর গর্তে জমা পানি নীল আকার ধারণ করেছে। গর্তের পাশে টিলা কাটা মাটির স্তূপ ঢিবির মতো। সোমবার দুপুরে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শাহ আরেফিন টিলায়প্রথম আলো


যত্রতত্র খোঁড়াখুঁড়ি করা গর্তে জল জমেছে। ঘোলা জল দীর্ঘদিন নড়াচড়াহীন থাকায় এখন স্বচ্ছ নীল। গর্তের পাশে স্তূপ করে রাখা টিলা কাটার মাটিতে কোনো আঁচড় না পড়ায় উঁচু ঢিবির মতো দেখাচ্ছে। নীল জল আর ঢিবিকে দূর থেকে ‘পিরামিড’ বলে বিভ্রম হয়। যেন এক অন্য রূপে ধরা দিয়েছে সিলেটের সীমান্ত উপজেলা কোম্পানীগঞ্জের আলোচিত শাহ আরেফিন টিলা।

সোমবার দুপুরে উপজেলা প্রশাসনের একটি দল শাহ আরেফিন টিলায় গিয়ে ধ্বংসলীলার টিলায় এমন রূপ দেখে বিস্মিত হয়েছেন। শুষ্ককালে টিলার এ রূপ যাতে অবিকল থাকে, এ জন্য আশপাশ এলাকাবাসীকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে এসেছে উপজেলা প্রশাসনের দলটি। স্থানীয় লোকজন বলছেন, এলাকাটি সংরক্ষণ করলে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় জায়গায় পরিণত হবে।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নে অবস্থিত শাহ আরেফিন টিলা। লালচে, বাদামি ও আঠালো টিলার মাটি। মাটি খুঁড়লেই মিলে বড় বড় পাথরখণ্ড। এসব পাথর উত্তোলন করতে যত্রতত্র গর্ত আর খোঁড়াখুঁড়িতে টিলার অস্তিত্ব বিলীন হয়েছে অনেক আগেই। টিলা বলতে শুধু নামটিই আছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করায় একের পর এক গর্তধসে শ্রমিক নিহতের ঘটনা ঘটছিল। সরকারি খাস খতিয়ানের ১৩৭ দশমিক ৫০ একর টিলাভূমির জায়গা এখন প্রায় সমান্তরাল।

default-image

উপজেলা প্রশাসন জানায়, টিলায় পাথর তুলতে গিয়ে গর্তধসে শ্রমিক হতাহতের প্রথম ঘটনা ঘটে ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি। ওই দিন একসঙ্গে ছয়জন শ্রমিক নিহত হয়েছিলেন। এরপর থেকে ওই এলাকায় শুধু জানুয়ারি মাসেই শ্রমিক হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটছে। শুধু শুষ্ককালে গত তিন বছর নিহত হয়েছেন ১৩ জন পাথরশ্রমিক।

বিজ্ঞাপন

এ পরিস্থিতি ঠেকাতে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত টাস্কফোর্সের ৪৩টি অভিযানে ১৬৮টি ‘বোমা মেশিন’ নামের অবৈধ পাথর উত্তোলন যন্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ২০ জানুয়ারি শ্রমিক নিহতের ঘটনার পর ৭ ফেব্রুয়ারি পাথরশ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়া শুরু করে উপজেলা প্রশাসন। পর্যায়ক্রমে প্রায় পাঁচ হাজার পাথরশ্রমিককে সরিয়ে দেওয়ার পর পাথর তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এখন পুরোপুরি মুক্ত অবস্থায় রয়েছে।

default-image

স্থানীয় লোকজন বলেন, টিলা এলাকা সমতল থেকে প্রায় ৪০-৫০ ফুট উঁচু। সেই উঁচু স্থানটি কেটে মাটির অন্তত ৩০০ ফুট গভীর গর্ত করে পাথর উত্তোলন চলত। একেকটি গর্তে তখন ঘোলা জল থাকত। তাতে কোনো পাথরশ্রমিক পড়লে মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটত। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে সেখানে কোনো ধরনের পাথর উত্তোলন না হওয়ায় সেই সব গর্ত নীল জলে পূর্ণ হয়েছে। খোঁড়া মাটি ছোট ছোট টিলায় রূপ নিয়েছে।

পশ্চিম ইসলামপুর ইউপি চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বলেন, শুষ্ক মৌসুমে টিলার আশপাশে কোনো পানি থাকত না। গভীর গর্ত খোঁড়ায় সেখানে পানি জমে স্বচ্ছ নীল রূপে দেখা যাচ্ছে। আর গর্ত খোঁড়ার মাটিগুলো দেখতে পিরামিডের মতো হওয়ায় অনেকেই মিসরের রূপ বলে দেখছেন। ইউপি চেয়ারম্যান মনে করেন, ধ্বংস টিলার এই রূপকে সংরক্ষণ করলে পর্যটকেরাও দেখতে আসবেন।

default-image

অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ করে পুরো এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখায় এমন রূপে শাহ আরেফিন টিলাকে দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন আচার্য। পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করার পর পুরো এলাকা কী অবস্থায় আছে, তা পর্যবেক্ষণে সোমবার দুপুরে গিয়ে তিনি রীতিমতো অবাক হয়েছেন। ইউএনও বলেন, ‘এলাকাটি দুর্গম। সীমান্তবর্তী। আমি ভেবেছিলাম চুরি করে হয়তো পাথর উত্তোলন করা হবে। তাই টাস্কফোর্স দল নিয়ে সেখানে গিয়েছিলাম। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সেখানে কাটিয়েছি। নীল জল আর ঢিবির মতো টিলা কাটা অংশ দেখতে পিরামিডের মতো দেখাচ্ছিল। এককথায় মিসরীয় রূপ। এই স্থান পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সংরক্ষণ করার প্রস্তাব করব।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0