default-image

চাইলেই যেখানে–সেখানে গভীর নলকূপ স্থাপন করে তা কৃষিকাজে ব্যবহার করা যাবে না। গৃহস্থালির কাজ, মাছ চাষ ও খাওয়ার পানি ব্যবহার করতে হবে নিয়ম মেনে। উঁচু বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রতিবছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এমনই বিধিনিষেধ আরোপ হতে যাচ্ছে।

এই বিধিনিষেধের আওতায় কোনো এলাকায় মাটির গভীরের একটি নির্দিষ্ট স্তরের পানি শুধু খাওয়ার কাজে ব্যবহার করা যাবে, ব্যাপক আকারে সেচকাজে ব্যবহার করা যাবে না। সম্প্রতি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনুযায়ী এমন মানচিত্রায়ণের কাজ শুরু করেছে ওয়াটার রিসোর্স প্ল্যানিং অর্গানাইজেশন (ওয়ারপো)। ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানিসম্পদের অবস্থা নির্ণয়ের জন্য দেশে প্রথমবারের মতো এমন মানচিত্রায়ণ হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাস্তবায়নের জন্য গঠিত কারিগরি কমিটির সদস্যরা।

উঁচু বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে শুরুতে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলায় এই মানচিত্রায়ণ করা হচ্ছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে মানচিত্রায়ণের জন্য জরিপের কাজ শুরু হয়েছে রাজশাহীর চারঘাট এলাকায়। কারিগরি কমিটির সদস্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান জানিয়েছেন, এই জরিপের মাধ্যমে দেশের পানিসংকটাপন্ন অঞ্চল চিহ্নিত করে পানি আইন অনুযায়ী এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে।

বিজ্ঞাপন
এমন হতে পারে, মাটির নিচে কাছের স্তরে পানি আছে। সে ক্ষেত্রে কাছের স্তরের পানি খাওয়ার জন্য এবং দূরের স্তরের পানি কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।
সারওয়ার জাহান, অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা ও এর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পানি আইনে বলা হয়, সরকার নির্বাহী কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পানিসম্পদ সংশ্লিষ্ট যেকোনো ভূমিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ‘পানিসংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করতে পারবে। পানিসংকটাপন্ন এলাকায় পানি পাওয়া সাপেক্ষে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আহরণ ও ব্যবহার করতে হবে। অগ্রাধিকারে শুরুতে থাকবে খাওয়ার পানি। দ্বিতীয় স্থানে গৃহস্থালির কাজ ও তৃতীয় স্থানে কৃষিকাজ। এ ছাড়া চতুর্থ স্থানে মৎস্য, পঞ্চম স্থানে পরিবেশের ভারসাম্য ও ষষ্ঠ পর্যায়ে বন্য প্রাণীর জন্য পানি ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ সরকার ও সুইচ এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশনের (এসডিসি) আর্থিক সহায়তায় ওয়ারপো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। গত রোববার এক ভার্চ্যুয়াল মিটিংয়ে কারিগরি কমিটির প্রথম বৈঠক হয়।

কারিগরি কমিটি সূত্রে জানা গেছে, মানচিত্রায়ণের কাজ শুরু হওয়া রাজশাহীর চারঘাটে মাটির নিচে পানি ধারক স্তরের সন্ধানে ২০০ মিটার গভীর পর্যন্ত অনুসন্ধান করা হয়। উঁচু বরেন্দ্র এলাকায় ৩০০ মিটার পর্যন্ত করা হবে। রাজশাহীর উঁচু বরেন্দ্র এলাকায় ২০০৪ সালের পর থেকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর গড়ে শূন্য দশমিক ২৬ মিটার করে নিচে নেমে যাচ্ছে। ২০০৪ সালের আগে শুকনো মৌসুমে পানির স্তর নিচে নেমে গেলেও বর্ষা মৌসুমে তা ভরে যেত। কিন্তু ২০০৪ সালের পর থেকে তা হচ্ছে না। ফলে অনেক এলাকায় হাতে চাপা নলকূপে পানি পাওয়া যায় না। আর্থিকভাবে সচ্ছল লোকজন সাব-মার্সিবল পাম্প বসিয়ে চাহিদা মেটালেও নিম্ন আয়ের মানুষ দুর্ভোগে পড়ছেন।

পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় খাওয়ার পানির সংকটে আছেন রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউনিয়নের জগদীশপুর এলাকার বাসিন্দারা। গত রোববার দুপুরে জগদীশপুরে গিয়ে দেখা যায়, একটি গভীর নলকূপ খুলে মেরামত করা হচ্ছে। এই নলকূপের অপারেটর বিউটি খাতুন। তাঁর বাবা মজিবুর রহমান বলেন, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে মেশিনের ওপরে চাপ পড়ে। তাই ঘন ঘন নষ্ট হয়ে যায়। ২০০ বিঘা জমিতে সেচের প্রকল্প এখন ৫০ বিঘায় নিয়ে আসা হয়েছে। এরপরও সব জমিতে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

অধ্যাপক সারওয়ার জাহান বলেন, পানির মানচিত্রায়ণ সারা দেশেই করা হবে। এই ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির অবস্থান জানা যাবে। এমন হতে পারে, মাটির নিচে কাছের স্তরে পানি আছে আবার দূরে আরেকটি পানি ধারক স্তর আছে। সে ক্ষেত্রে কাছের স্তরের পানি শুধু খাওয়ার জন্য এবং দূরের স্তরের পানি কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন