default-image

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যখন স্বাক্ষরিত হয়, অর্থাৎ ১৯৯৭ সালে, সাজেক ইউনিয়নে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৮। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার এ ইউনিয়ন আয়তনে মেহেরপুর জেলার চেয়ে ২০ বর্গকিলোমিটার বড়। চুক্তির ২২ বছর পর এখন এ ইউনিয়নে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৬।

পাহাড়ে শিক্ষা খাতের মতো প্রায় সব ক্ষেত্রে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। তবে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে। পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি খুনোখুনির ঘটনা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। গত ৬ বছরে পাহাড়ি-বাঙালিসহ মোট ৩২১ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে সর্বশেষ ২ বছরে ১২৫ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ভূমি বিরোধের সমস্যাও নিরসন হয়নি।

অস্থিরতা বন্ধ হচ্ছে না কেন, জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরুপা দেওয়ান প্রথম আলোকে বলেন, পাহাড়ের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণ কী, তা সবার জানা। পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্য এর অন্যতম কারণ। কিন্তু সরকার এই সমস্যার সমাধানে দ্রুত আন্তরিক না হলে পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হবে।

উন্নয়নের স্রোত

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে ২০০১ সালে পাহাড়ে পাকা রাস্তা ছিল ৬৩১ কিলোমিটার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৮ সালের হিসাবে এ ধরনের সড়ক এখন দ্বিগুণের বেশি। ৬১ শতাংশ পরিবারের স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ছিল না প্রায় দুই দশক আগে। এখন তা ৩২ শতাংশ। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় সৃষ্টির বছর উন্নয়ন বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৫৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে এর পরিমাণ ১৭ গুণ বেড়ে হয়েছে ৮৫৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা।

গলার কাঁটা ভূমি বিরোধ

পার্বত্য চুক্তির ৪৮টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবি করছে প্রশাসন। যদিও তা মানতে নারাজ জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও আঞ্চলিক পরিষদ। ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ও জেএসএসের মধ্যে সম্পাদিত পার্বত্য চুক্তিতে ৭২টি ধারা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির ধারা। কিন্তু এর কোনো কূলকিনারা হয়নি। একই কারণে ভারত-প্রত্যাগত শরণার্থী পুনর্বাসন প্রক্রিয়াও পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

এই অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে পাহাড়ের মানুষদের মধ্যে চাপা আতঙ্কের পাশাপাশি ক্ষোভও বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে এসব বিষয়ে কথা বলতে রাজি নন। তবে তাঁরা পাহাড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা চান।

তবে চুক্তি বাস্তবায়নে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাঙামাটির সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার।

সহিংসতা

চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়া সহিংসতার অন্যতম কারণ বলে অনেকে মনে করছেন। কখনো নিজেদের মধ্যে আধিপত্য, স্থানীয়, জাতীয় নির্বাচনসহ নানা কারণে পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়েছে।

>

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক যোগাযোগব্যবস্থায় উন্নতি
আবার ২ বছরে ১২৫ জন নিহত

বর্তমানে পাহাড়ে চারটি আঞ্চলিক সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে চুক্তির পক্ষে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। চুক্তির পর এর বিরোধিতা করে জন্ম নেয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এই সংগঠন ভেঙে ২০১৭ সালের নভেম্বরে পাহাড়ে গঠিত হয় নতুন দল ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। এ ছাড়া জেএসএস থেকে বেরিয়ে ২০১০ সালে গঠিত হয় জেএসএস (এমএন লারমা) নামের একটি সংগঠন।

রাঙামাটির সাজেক এলাকার উন্নয়ন নিয়ে স্থানীয় মানুষেরা কথা বলতে আগ্রহী। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সবার মুখে কুলুপ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে উলুছড়ি গ্রামের এক ব্যক্তির কথায়, ‘আমাদের রাস্তা হয়েছে, স্কুল হয়েছে কিন্তু দিন দিন ভয় বাড়ছে। আগে এক দলকে চাঁদা দিতাম, এখন তিন-চার দলকে দিতে হয়।’

জেএসএসের হামলায় ২০১৭ সালে আহত হয়েছিলেন বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রাসেল মারমা। আর জুরাছড়ি উপজেলা সদরের রুপকুমার চাকমার বাবা জেলা পরিষদ সদস্য ও বিএনপি নেতা কিনা মোহন চাকমা ২০০৭ সালে খুন হন। তাঁরা প্রথম আলোকে বলেন, পাহাড়ে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নেই। সবাই এখানে শান্তি চান।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য, ২০১৭-এর নভেম্বরে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামের দল গঠনের পরই নতুন করে সংঘাতের সৃষ্টি। ইউপিডিএফের সংগঠক অংগ্য মারমা মুঠোফোনে বলেন, পার্বত্য জনগোষ্ঠীকে অধিকারবঞ্চিত করতে পরিকল্পনামাফিক একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। এর ফলে পাহাড়ের মানুষ শঙ্কিত। চাঁদাবাজির বিষয়টি ভিত্তিহীন।

গত দুই বছরে নিহত ১২৫ জনের মধ্যে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সংঘাতে মারা গেছেন ৬৭ জন। চুক্তির বার্ষিকীর আগের দিন গতকাল রোববার খুন হয়েছেন জেএসএস কর্মী কমল বিকাশ চাকমা।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক একাধিক বইয়ের লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মোহসীন শিক্ষক বলেন, মোটা দাগে স্বস্তি বা নিরাপত্তার যে বিষয়টি, তা এখনো অধরাই রয়ে গেছে। এটা রোধে পাহাড়ি ও বাঙালির একটা ঐক্য দরকার। আর এ জন্য উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর মনে করেন, পাহাড়ে উন্নয়নে এসব হানাহানি কোনো প্রতিবন্ধক নয়।

কোনো এলাকার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে এর দায় সরকারের ওপর বর্তায় কি না, প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রীর বক্তব্য, হানাহানি দূর করতে সরকার আন্তরিক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0