মহিবুর রহমান জানান, হাওরের ধান পাকা ছিল। অনেকেই সেই ধান কাটা, মাড়াই শুরু করেছিলেন। তিনি অর্ধেক জমির ধান কেটে মাড়াই করে হাওরের খলায় (ধানমাড়াই ও শুকানোর স্থান) রেখেছিলেন। হাওরে যখন পাহাড়ি ঢল ও অকালবন্যা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে, তখন ২৬ এপ্রিল তাঁদের কপাল পোড়ে। রাতে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে যায়। হু হু করে বৌলাই নদের পানি ঢুকে পড়ে হাওরে। ভাসিয়ে নিয়ে যায় খলায় রাখা শুকনা ধান। তলিয়ে যায় হাওরের ফসল। মহিবুর রহমান বলেন, ‘আফসোস, যখন বাঁধ ভাঙার কথা, তখন ভাঙেনি, আর যখন মনে করেছিলাম আর ভাঙবে না, তখন ভাঙল। ২৫০ মণ শুকনা ধান ঢলের পানিতে ভেসে গেছে। শুধু আমার একার নয়, গ্রামের অনেক কৃষকই একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব পরিবারে ঈদের আনন্দের বদলে ফসল হারানোর কষ্ট আছে।’

আহসানপুর গ্রামের বাসিন্দা সবুন নেছা (৫০) জানান, তাঁর এক মেয়ে আছে। আর কেউ নেই। হাওরে তিন বিঘা জমি আবাদ করিয়েছিলেন। এই জমির ধানে আর মাঝেমধ্যে শ্রমিকের কাজ করেই সংসার চলে। কিন্তু এক গোছা ধানও কাটতে পারেননি। পাকা ধান তলিয়েছে। সবুন নেছা বলেন, ‘আশায় আছিলাম, ধান পাইলে মা-মেয়ে ঈদে নতুন কাপড় কিনমু। এখন কাপড়ের চিন্তা বাদ দিয়া খাওয়ার চিন্তায় আছি। ঘরও কোনো চালপাত নাই।’

আহসানপুর গ্রামের আরেক কৃষক আবদুর রাকিদ (৬০) জানান, সাত একর জমির মধ্যে অর্ধেক ধান তুলতে পেরেছেন তিনি। বাকি জমির ধানও পেকেছিল। কিন্তু নদীতে পানি কমায় ধীরে ধীরে কাটবেন বলে চিন্তা করেছিলেন। পরে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় আর এসব জমির ধান কাটতে পারেননি। কৃষক রাকিদ বলেন, ‘কিছু ধান পাইছি। কিন্তু যারা একেবারে পায় নাই, তারা তো ফকির হয়ে গেছে। মানুষ কীভাবে চলব। এলাকায় কোনো কাজকাম নাই। বড় কষ্টে আছে মানুষ।’

default-image

সুনামগঞ্জে এবার এপ্রিলের প্রথম থেকেই পাহাড়ি ঢল নামতে থাকে। এতে জেলার নদ-নদী ও হাওরে ব্যাপক পরিমাণে পানি বৃদ্ধি পায়। ঝুঁকিতে পড়ে হাওরের ফসল। ফসল রক্ষা বাঁধগুলো ঠেকাতে দিনরাত হাওরে কাজ করেন স্থানীয় কৃষক, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। এরপরও ২ এপ্রিল থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত জেলার অন্তত ২০টি হাওরের বাঁধ ভেঙে ও বাঁধ উপচে হাওরের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষি বিভাগের হিসাবমতে, প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যায়, এতে প্রায় ২০ হাজার কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার হেক্টর।

সুনামগঞ্জে এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দিরাই উপজেলায়। এই উপজেলার চাপতির হাওরের বাঁধ ভেঙে ফসলহানি ঘটে ৭ এপ্রিল। ৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির এই হাওরের ধান তখন কাঁচা। হাওরডুবিতে তিনটি ইউনিয়নের ৪৬টি গ্রামের মানুষের ফসল গেছে।

এই হাওরপাড়ের তাজপুর গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন (৫০) এখন নিজের ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু হাওরের ফসল হারিয়ে এখন দিশাহারা। বছরের খোরাকি জোগারের চেষ্টায় ছেলেদের নিয়ে অন্য এলাকায় গিয়ে ধান কাটার শ্রমিকের কাজ করছেন।

আবুল হোসেন ১২ একর জমি আবাদ করেছিলেন। জমি চাষবাসের সুবিধার জন্য কার্তিক মাসে পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসে হাওরপাড়েই গড়েছিলেন অস্থায়ী আবাস। প্রায় ৬০০ মণ ধান নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা, কিন্তু ফিরেছেন শূন্য হাতে।

আবুল হোসেন ১২ একর জমি আবাদ করেছিলেন। জমি চাষবাসের সুবিধার জন্য কার্তিক মাসে পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসে হাওরপাড়েই গড়েছিলেন অস্থায়ী আবাস। প্রায় ৬০০ মণ ধান নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা, কিন্তু ফিরেছেন শূন্য হাতে। আবুল হোসেন জানান, এসব জমির আবাদ করতে গিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। ধারদেনা করে আনা এই টাকা ফসল তোলার পর শোধ করার কথা। আবুল হোসেন বলেন, ‘আমি এখন পথের ফকির। কিলা খাইতাম কিলা, কিলা চলতাম এই চিন্তায় পাগল।’

আবুল হোসেনের স্ত্রী সোনারা বেগম (৪২) বলেন, ‘ঘরে কোনো চাল নাই। এখন বাপ-ছেলেরা মিলে রুজি করে আনলে চুলা জ্বলে, না অইলে উপাস।’ ঈদে কী করবেন জানতে চাইলে সোনারা বলেন,‘মনে ত কত আশাই আছিল। আনন্দ করমু, কাপড় কিনমু, পিঠা-সন্দেশ বানাইমু। ধান পাইলে আশা পূরণ অইত, ধান নাই, আনন্দও নাই।’

শান্তিগঞ্জ উপজেলার মোল্লার হাওর ১০ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন কৃষক জাফির মিয়া (৫৫)। এই জমি আবাদ করতে নিজের শ্রম বাদে সার, বীজ ও অন্যান্য খরচ বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে ঋণ আছে ২৪ হাজার টাকার। স্ত্রী, তিন ছেলে ও দুই মেয়ে মিলে সাতজনের সংসার। তিন ছেলে ও এক মেয়ে পড়ালেখা করে। বড় ছেলে সোহাগ আহমদ এবার এসএসসি দেবে। অন্যরা কেউ মাধ্যমিক, কেউ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে।

জাফির মিয়া বলেন, এই ধানের ওপর সবকিছু নির্ভর করে। পরিবারের খাওয়াদাওয়া, বাজারসদাই, লেখাপড়া সব। এবার এক গোছা ধানও কাটতে পারেননি। ফসল ডোবার পর থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এক বছর পরিবার নিয়ে তিনি কীভাবে চলবেন, কীভাবে ছেলেমেয়েদের পড়ার খরচ জোগাবেন, এটাই এখন বড় চিন্তা। জাফির আলী বলেন, ‘এই কষ্ট বলে বোঝানো যাবে না। ছেলেমেয়ের মুখের দিকে তাকাতে পারি না। অথচ এখন উগার (গোলা) ভরা ধান থাকার কথা আছিল।’

আমরা শুরু থেকেই বলছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ এখনো লক্ষ করা যায়নি। শুধু মুখে মুখে বড় বড় কথা বললে হবে না। কৃষকদের পরিবারের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াসহ সব ধরনের সহযোগিতা দিতে হবে।
আবু সুফিয়ান, সভাপতি, হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটি

হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেছেন, ‘আমরা শুরু থেকেই বলছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ এখনো লক্ষ করা যায়নি। শুধু মুখে মুখে বড় বড় কথা বললে হবে না। কৃষকদের পরিবারের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াসহ সব ধরনের সহযোগিতা দিতে হবে।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এবার জেলায় ২ লাখ ২২ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। জেলায় ১৯টি হাওরে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেছেন, জেলায় ধান আবাদের তুলনায় ক্ষতি হয়তো বেশি না। তারপরও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে সরকার দাঁড়িয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা হয়েছে। ইতিমধ্যে তাঁদের ১০ লাখ টাকা, ২২০ মেট্রিক টন চাল ও শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তাঁদের আরও সহযোগিতা দেওয়া হবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন