default-image

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি আঞ্চলিক দলের মধ্যে সংঘাত, হানাহানি যখন বেড়ে চলছিল, তখন ২০১৫ সালে ‘অলিখিত’ এক সমঝোতায় তা বন্ধ হয়। জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), ইউপিডিএফ এবং জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-লারমা) নেতাদের ‘উপলব্ধি’তে পাহাড়ে সংঘাত কমে আসে। তবে এটা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আড়াই বছরের মাথায় ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে সংঘাত, হানাহানি আবার শুরু হয়। গত তিন বছরে পাহাড়ে প্রাণ গেছে ১১৯ জনের।

এখনকার হানাহানি ও অতীতের সংঘাতের ঘটনার মধ্যে একটা তফাত রয়েছে বলে মনে করছেন আঞ্চলিক দলগুলো ও স্থানীয় লোকজন। গত তিন বছরে বেশির ভাগ সংঘাতের লক্ষ্যবস্তু ছিল প্রতিপক্ষ দলের নেতাদের হত্যা করা। এটাকে অশনিসংকেত বলে মন্তব্য করেছেন পার্বত্য নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দলগুলোর মধ্যে সংঘাত বাড়ছে। ২৩ বছরেও পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। সব মিলিয়ে পাহাড়ের মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। যুবসমাজ বিক্ষুব্ধ হচ্ছে।

নিহতদের মধ্যে ৮৭ জনই পার্বত্য এলাকার চারটি আঞ্চলিক দলের নেতা-কর্মী। এর মধ্য ইউপিডিএফের ৩৮ জন, জেএসএসের (লারমা) ৩৬ জন, জেএসএসের ১৩ জন ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের ১ জন রয়েছেন। অন্যদের মধ্যে ২০ জন সাধারণ নাগরিক, একজন সেনাসদস্য, বিএনপির নেতা ১ জন, আওয়ামী লীগের ৮ জন ও মগ পার্টির ১ জন রয়েছেন।

পার্বত্য তিন জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হানাহানির ঘটনা ঘটেছে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে। এই দুই জেলায় নিহত হন ১০১ জন। আর বান্দরবানে নিহত হন ১৮ জন।

বিজ্ঞাপন
২৩ বছরেও পার্বত্য চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। পাহাড়ের মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। সেখানকার দলগুলোর মধ্যে বাড়ছে সংঘাত।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পাহাড়ে সংঘাতের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করে এমন বিভিন্ন সংস্থার রাখা হিসাব এটি। এ ছাড়া অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ছোট-বড় হামলার ঘটনাও ঘটছে পাহাড়ে।

আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব, চাঁদা আদায়, ভাগ-বাঁটোয়ারাকেই সংঘাত-হানাহানির পেছনে মূল কারণ বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দা, নাগরিক সমাজ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোও বলছে, হানাহানির পেছনে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নেতাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় যুক্ত রয়েছে। তবে আঞ্চলিক দলগুলোর নেতারা বলছেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের মধ্যে হতাশা থেকে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ে একসময় জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) নামের মাত্র একটি দল ছিল। এই দলের সঙ্গেই ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি করেছিল সরকার। চুক্তির বিরোধিতা করে প্রথমে একটি অংশ জেএসএস থেকে বেরিয়ে নতুন দল করে। পরবর্তী সময়ে দুটি দল ভেঙে এখন চারটি দল হয়েছে।

জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সহসভাপতি ও সাবেক সাংসদ উষাতন তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, সরকার পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না করায় হতাশা থেকে দলগুলোতে দ্বন্দ্ব এবং বিভক্তি বেড়েছে। তাই মানুষ হয়তো ধৈর্যহারা হয়ে এখন যার যার স্বার্থ নিয়ে খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ার দিকে চলে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও সন্দেহ-দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। এখানে সরকারের যে কৌশল, তা পুনর্মূল্যায়ন হওয়া দরকার।

তবে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত রাঙামাটির সাংসদ দীপংকর তালুকদার মনে করেন, সংঘাতের পেছনে আদর্শিক কোনো ব্যাপার নেই। এর সঙ্গে চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টিকে মেলানো যাবে না। ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীগত স্বার্থের কারণে দলগুলোর মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়েছে। চুক্তির পক্ষের জনসংহতি সমিতিই দুই ভাগ হয়েছে। তাদের কেউ কেউ চুক্তিবিরোধীদের সঙ্গেও হাত মেলাচ্ছে। ফলে তারা সবাই যে এখন স্বার্থ, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে মূল কাজ হিসেবে নিয়েছে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

২৩ বছরের চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি

আজ ২ ডিসেম্বর। পার্বত্য চুক্তির ২৩ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৯৭ সালের এই দিনে সরকার কর্তৃক গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে এখন পর্যন্ত চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।

সরকারি সূত্র বলছে, পার্বত্য চুক্তির ৭২টি দফার ৪৮টির পূর্ণাঙ্গ এবং ১৫টি আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। বাকি ৯টি দফা বাস্তবায়নাধীন।

তবে জেএসএসের নেতারা বলছেন, চুক্তির ৪৭টি দফাই বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁরা ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিকেই মূল দফা হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। তাঁদের মতে, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করার যে দফাটি আছে, সেটি বাস্তবায়িত না হলে এই চুক্তি কখনো পূর্ণতা পাবে না।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহসাধারণ সম্পাদক পল্লব চাকমা জানান, ভূমি কমিশনে এখন পর্যন্ত ২২ হাজার ৮৬৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ২০১৬ সালে আইন সংশোধিত হয়েছে কিন্তু এখন পর্যন্ত বিধিমালা হয়নি। এতে পাহাড়িদের কাছে কী বার্তা যাচ্ছে? তাঁর দাবি, সরকার চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করে সমস্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

চুক্তির বিরোধিতা ও হানাহানি

পার্বত্য চুক্তির এক বছরের মধ্যেই এই চুক্তির বিরোধিতা করে গঠিত হয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। চুক্তির পক্ষের জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সঙ্গে ইউপিডিএফের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের শুরুটা সে সময়ে। ওই দুই দলের তিন শতাধিক নেতা-কর্মী নিহত হন। ২০১০ সালে জনসংহতি সমিতি ভেঙে গঠিত হয় জনসংহতি সমিতি (লারমা) বা জেএসএস (লারমা) নামের নতুন দল। এরপর শুরু ত্রিমুখী সংঘাত। পাঁচ বছরে তিন দলের আরও প্রায় চার শতাধিক নেতা-কর্মী নিহত হন। পরে ২০১৫ সালে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে না জড়াতে অলিখিত চুক্তি করে দল তিনটি।

নতুন ভাঙন, নতুন সংঘাত

২০১৭ সালে খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি হয়। ওই বছরের ১৫ নভেম্বর তপনজ্যোতি চাকমার নেতৃত্বে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নামের নতুন দল আত্মপ্রকাশ পায়। এতে নতুন দল ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক ও জেএসএসের (লারমা) মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠে। নতুন করে সংঘাতের শুরু হয়। ইউপিডিএফ অভিযোগ তোলে, জেএসএস (লারমা) সহায়তা দিচ্ছে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিককে। এতে ২০১৫ সালে করা জেএসএস লারমার সঙ্গে ইউপিডিএফের সমঝোতা ভেঙে যায়। ২০১৭ সালে ৫ ডিসেম্বর নতুন করে শুরু হয় চতুর্মুখী সংঘাত।

গত তিন বছরে নিহতের মধ্যে রয়েছেন ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের প্রধান তপনজ্যোতি চাকমা, জেএসএসের (লারমা) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা, ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় নেতা মিঠুন চাকমাসহ বেশ কয়েকজন প্রথম সারির নেতা।

সংঘাতের শেষ কোথায়

পার্বত্য চট্টগ্রামে এই হানাহানি-সংঘাতের শেষ কোথায়? এ নিয়ে আঞ্চলিক দলগুলোর কয়েকজন নেতা ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা মনে করেন, এখন যে সংঘাত, তাকে আদর্শিক বলা যায় না। কিন্তু এর পেছনে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা রয়েছে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর যে পার্বত্য চুক্তি হয়েছিল, তার যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে সংকটের সৃষ্টি।

চুক্তি স্বাক্ষরকারী দল জেএসএসের সহসভাপতি উষাতন তালুকদার মনে করেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হলে পাহাড়ের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

মানবাধিকারকর্মী নিরুপা দেওয়ানের মতে, পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরকারী উভয় পক্ষ অনেক দূরত্বে অবস্থান করছে। দল-উপদল হচ্ছে। এখনই সমাধান না হলে পাহাড়ে জমি বেদখল ও সংঘাত বেড়ে যাবে।

মন্তব্য করুন