মঞ্চের সামনের দিকে মাটিতে বসে বেশ আগ্রহ নিয়ে যাত্রা দেখছেন ষাটোর্ধ্ব অরবিন্দু মণ্ডল। মঞ্চের অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মুখের ভঙ্গিও পরিবর্তন হচ্ছে। একটু জায়গা করে নিয়ে অরবিন্দু মণ্ডলের পাশে গিয়ে ‘কেমন লাগছে’ জিজ্ঞাসা করতেই যেন সংবিৎ ফিরে পান তিনি। একবার মুখের দিকে তাকিয়ে ভালো করে দেখে নেন। যাত্রা দেখতে কেমন লাগছে? কত দিন পর যাত্রা দেখছেন? জিজ্ঞাসা করতেই বলে ওঠেন, ‘বেশ ভালো। একসময় গ্রামগঞ্জে প্রায় প্রতি এলাকায় যাত্রা হতো। এখন আর হয় না। এখন শুধু দুর্গাপূজার সময় কোনো কোনো এলাকায় যাত্রাপালা হয়। তবে সেটা স্থানীয় ব্যক্তিরা আয়োজন করতেন। করোনার কারণে গত দুই বছর সেটাও বন্ধ ছিল।’

বেশ আবেগ নিয়ে অরবিন্দু বলেন, ‘আগে কোথাও যাত্রা হবে শুনলেই দল বেঁধে সেখানে যেতাম। মাইলের পর মাইল হেঁটে সারা রাত যাত্রা দেখে সকালের দিকে বাড়ি ফিরতাম। এখন আর তা হয়ে ওঠে না। তবে যাত্রা দেখতে খুব ভালো লাগে।’

ঘড়ির কাঁটা তখন রাত আটটা ছুঁই ছুঁই। খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়ন ফুটবল মাঠটি দর্শকে প্রায় পরিপূর্ণ। তখনো মানুষ আসছেন মাঠে। দর্শকের সারিতে আছেন, নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশু থেকে শুরু করে সব শ্রেণি–পেশার মানুষ। তবে অধিকাংশ ছিলেন নারী দর্শক। যাত্রাকে কেন্দ্র করে অনেকটা মেলার মতো দোকান বসেছে মাঠের চারপাশে।

default-image

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ওই মাঠে যাত্রাপালার উদ্বোধন করা হয়। খুলনা জেলা শিল্পকলা একাডেমি সেখানে যাত্রার আয়োজন করেছে। আজ রোববার সেখানে পরপর দুটি যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম যাত্রাপালাটি ছিল এমএ মজিদ রচিত ‘মরমি কবি বিজয় সরকার’। খুলনার স্বদেশ অপেরা সেটি মঞ্চস্থ করে। আর দ্বিতীয় যাত্রাপালাটি ছিল ‘মৃত্যুশয্যায় ময়ূর নদ’। সেটি মঞ্চস্থ করেন খুলনার রাজমহল অপেরার শিল্পীরা। আগামীকাল সোমবারও একই মঞ্চে দুটি যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হবে। লক্ষণ চন্দ্র ধর রচিত ‘নদী ভাঙ্গা মাটির ঘর’ নামের যাত্রাপালাটির নির্দেশনা দিয়েছেন প্রণব মণ্ডল আর স ম গোলাম মোস্তফা রচিত ‘অনেক রক্তে কেনা’ যাত্রাপালাটিতে অভিনয় করবেন মঞ্জুশ্রী অপেরার শিল্পীরা।

প্রায়ই দেড় ঘণ্টা পর শেষ হয় ‘মরমি কবি বিজয় সরকার’ যাত্রাপালাটি। এরপর ওই মাঠেই কথা হয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দীপঙ্কর রায়ের সঙ্গে। তিনিও মাঠে বসে যাত্রাপালাটি দেখেছেন। দীপঙ্কর রায় বলেন, ‘যাত্রা আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ। কিন্তু সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে এই জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যমটি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। একসময় আমাদের দেশের নামকরা সব অপেরা প্রতিষ্ঠান ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে কোনো মেলা বা এলাকায় যাত্রা মঞ্চস্থ করত। এখন সেসব অপেরাও নেই, নেই শিল্পীরাও। দেরিতে হলেও যাত্রাশিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি যে এগিয়ে এসেছে, তার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ধন্যবাদ দিতে হয়।’

আয়োজকেরা জানান, দেশব্যাপী ১০০টি নতুন যাত্রাপালা নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ‘যাত্রাশিল্পের নবযাত্রা’ শীর্ষক বাংলাদেশ যাত্রা উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় খুলনা জেলায় দুটি পর্বে যাত্রা উৎসব উদ্‌যাপিত হচ্ছে। এর আগে ১৫ ও ১৬ মার্চ ডুমুরিয়া উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে চারটি যাত্রাপালা প্রদর্শিত হয়েছিল।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন