default-image

বগুড়ার একটি আদালতে চাঁদাবাজি ও মারামারির দুটি মামলার বিচারকাজ চলাকালে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে হাজির না হওয়ায় পুলিশকে সাক্ষী হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতে লিখিতভাবে জানানো হয়, ২০১৮ সালের ৮ মার্চ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ধুনট থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেন মারা গেছেন।

তবে পুলিশের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বাদীপক্ষ আজ বুধবার একই আদালতে মামলা করেছে। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, সাক্ষী আনোয়ার হোসেন মারা যাননি। তিনি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশে পরিদর্শক পদে কর্মরত আছেন। আসামিপক্ষের যোগসাজশে পুলিশ মিথ্যা তথ্য দিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করছে। জীবিত সাক্ষী হাজিরসহ জাল কাগজপত্র জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত লোকজনের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আদালতে প্রার্থনা করা হয়। বগুড়ার ধুনট উপজেলার কৈগাড়ি গ্রামের নূরন্নবী তালুকদার বাদী হয়ে বগুড়ার স্পেশাল জজ আদালতে এই মামলা করেছেন। তবে আদালতের বিচারক ইমরান হোসেন অভিযোগের কোনো শুনানি এখনো করেননি। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এ এইচ এম গোলাম রব্বানী খান মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতে লিখিতভাবে জানানো হয়, ২০১৮ সালের ৮ মার্চ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ধুনট থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেন মারা গেছেন। পুলিশের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বাদীপক্ষ আজ বুধবার একই আদালতে মামলা করেছে। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, সাক্ষী আনোয়ার হোসেন মারা যাননি।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালে ধুনট উপজেলার নাগেশ্বরগাঁতি মৌজায় ৭১ শতক জমি নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ধান কেটে নেওয়া ও হামলার অভিযোগ এনে কৈগাতি গ্রামের নূরন্নবী তালুকদার ১২ জনকে আসামি করে ধুনট থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত শেষে তৎকালীন ধুনট থানার উপপরিদর্শক আনোয়ার হোসেন ২০১১ সালের ১৭ জুন আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

অন্যদিকে, ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ১৬ জনকে আসামি করে চাঁদাবাজির আরেকটি মামলা করেন কৈগাতি গ্রামের হাসান আলী তালুকদার। এই মামলাটিও তদন্ত করেন ধুনট থানার উপপরিদর্শক আনোয়ার হোসেন। তিনি ২০১২ সালের ৭ মে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। দুটি অভিযোগপত্রে আনোয়ার হোসেন নিজের পদবি উপপরিদর্শক উল্লেখ করলেও তাঁর বিপি নম্বর উল্লেখ করেননি।

অনেকই মৃত্যুসনদ নেন। গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়েই সনদ দেওয়া হয়। জীবিত কোনো ব্যক্তিকে মৃত্যুসনদ দেওয়ার কথা নয়।
শিবনাথ মিশ্র, মহাদেবপুর উপজেলার চেরাগপুর ইউপি চেয়ারম্যান
বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, দুটি মামলার স্পেশাল জজ আদালতে বিচারকাজ চলছে। আদালতে সাক্ষী হাজির না হওয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তার নামে গত ৬ জানুয়ারি সাক্ষী-ওয়ারেন্ট জারি করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০ জানুয়ারি বগুড়ার পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকে আদালতে পাঠানো একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মামলার সাক্ষী এসআই আনোয়ার হোসেন (বিপি নম্বর ৬৬৮৭০৬৫৬২৮) ২০১৮ সালের ৮ মার্চ মৃত্যুবরণ করায় তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব নয়। পুলিশ সুপারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসআই আনোয়ার হোসেনের গ্রামের বাড়ি নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার বাজিতপুর গ্রামে। প্রতিবেদনের সঙ্গে মহাদেবপুর উপজেলার চেরাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানের দেওয়া একটি মৃত্যুসনদও দাখিল করা হয়।

প্রথম আলোর পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১১ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ধুনট থানায় আনোয়ার হোসেন নামে দুজন উপপরিদর্শক ছিলেন।

আজ বুধবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে চেরাগপুর ইউপি চেয়ারম্যান শিবনাথ মিশ্র প্রথম আলোকে বলেন, অনেকই মৃত্যুসনদ নেন। গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়েই সনদ দেওয়া হয়। জীবিত কোনো ব্যক্তিকে মৃত্যুসনদ দেওয়ার কথা নয়। চেয়ারম্যান মৃত্যুসনদের একটি ফটোকপি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে বলেন। পরে কপি পাঠানো হলেও তিনি আর প্রত্যুত্তর দেননি।

প্রথম আলোর পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১১ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ধুনট থানায় আনোয়ার হোসেন নামে দুজন উপপরিদর্শক ছিলেন। একজনের বাড়ি নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলায়। তিনি ২০১৮ সালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি ধুনট থানায় আনোয়ার হোসেন-২ নামে পরিচিত ছিলেন। অন্যজন বর্তমানে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের পরিদর্শক পদে কর্মরত। তাঁর বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলায়। তিনি ধুনট থানায় কর্মরত থাকাকালে আনোয়ার হোসেন নামে পরিচিত ছিলেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন সিলেটে কর্মরত আনোয়ার হোসেন। কিন্তু পুলিশ প্রতিপক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আনোয়ার হোসেনকে ‘মৃত’ উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে।
নূরন্নবী তালুকদার, চাঁদাবাজি মামলার বাদী

প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আদালতে দাখিল করা দুটি অভিযোগপত্র সংগ্রহ করে দেখা গেছে, সেখানে শুধু আনোয়ার হোসেন উল্লেখ রয়েছে। বিপি নম্বর উল্লেখ নেই।

চাঁদাবাজি মামলার বাদী নূরন্নবী তালুকদার বলেন, তাঁদের মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন সিলেটে কর্মরত আনোয়ার হোসেন। কিন্তু পুলিশ প্রতিপক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আনোয়ার হোসেনকে ‘মৃত’ উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে। একটি মামলার ধার্য তারিখ ছিল আজ বুধবার। অন্যটির শুনানির দিন ধার্য রয়েছে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি।

ধুনট থানায় দুজন আনোয়ার হোসেন কর্মরত ছিলাম। তবে অন্যজন আনোয়ার হোসেন-২ লিখতেন। নূরন্নবী তালুকদার এবং তাঁর প্রতিপক্ষের দায়ের করা ৫-৬টি মামলার মধ্যে কয়েকটি আমি তদন্ত করেছি, কয়েকটি আনোয়ার হোসেন-২ তদন্ত করেছেন। তবে কে কোন মামলা তদন্ত করেছি, এত দিন পর তা মনে নেই।
আনোয়ার হোসেন, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের পরিদর্শক

মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের পরিদর্শক আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ধুনট থানায় দুজন আনোয়ার হোসেন কর্মরত ছিলাম। তবে অন্যজন আনোয়ার হোসেন-২ লিখতেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘নূরন্নবী তালুকদার এবং তাঁর প্রতিপক্ষের দায়ের করা ৫-৬টি মামলার মধ্যে কয়েকটি আমি তদন্ত করেছি, কয়েকটি আনোয়ার হোসেন-২ তদন্ত করেছেন। তবে কে কোন মামলা তদন্ত করেছি, এত দিন পর তা মনে নেই। মামলার অভিযোগপত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তার নাম, পদবি ছাড়াও বিপি নম্বর উল্লেখ থাকার কথা। আমার বিপি নম্বর ৬৭৮৬১২৩২২১। অভিযোগপত্রে বিপি নম্বর উল্লেখ না থাকলে এত দিন পর শনাক্ত করা মুশকিল, কে কোন মামলা তদন্ত করেছি। আদালতের নোটিশ পেলে হাজির হব। নথি দেখলে বোঝা যাবে অভিযোগপত্রে আমার নাম স্বাক্ষর আছে কি না।’

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন