default-image

সুনামগঞ্জের ধরমপাশায় বৃদ্ধকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় ‘মিথ্যা তথ্য দিয়ে’ পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বৃদ্ধের ছেলে চন্দন বর্মণ। থানায় তাঁর দেওয়া লিখিত অভিযোগ গ্রহণ না করে অন্য একটি এজাহার তৈরি ও সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াকে বেআইনি উল্লেখ করে চন্দন আইনগত প্রতিকার চেয়ে পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন করেছেন।

পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। এ জন্য পুলিশের বিশেষ দল কাজ করেছে। বেশ কিছু লোক জেলে আছে। নিহত বৃদ্ধের পরিবারের লোকজনের উচিত পুলিশকে সহযোগিতা করা, যাতে প্রকৃত দোষীরা আইনের আওতায় আসে।

গত বৃহস্পতিবার (৭ জানুয়ারি) রাতে উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের সুনই জলমহালে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও মৎস্যজীবী শ্যামাচরণ বর্মণকে (৬৫) গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটে। আহত হন আরও ১৫-২০ জন। ঘটনার পর শনিবার সন্ধ্যায় সুনই মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি ও নিহতের ছেলে চন্দন বর্মণ (৩০) স্থানীয় সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেন ওরফে রতন (৫২), তাঁর ছোট ভাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন ওরফে রোকন (৩২), সাংসদের বড় ভাই উপজেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মোবারক হোসেন ওরফে মাসুদসহ (৫৫) ৬৩ জনকে আসামি করে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেন। পুলিশ তাঁদের মামলাটি এখনো এজাহার হিসেবে গ্রহণ করেনি।

পুলিশ তাঁদের বলেছে, মামলা থেকে স্থানীয় সাংসদের নাম বাদ না দিলে তারা মামলা নেবে না। তবে ধরমপাশা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, চন্দন বর্মণের দেওয়া লিখিত অভিযোগে বেশ কিছু ত্রুটি ছিল। সেগুলো সংশোধন করে আবার থানায় জমা দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে আর সেটি থানায় জমা দেওয়া হয়নি।

ধরমপাশা থানা তাঁর দায়ের করা অভিযোগ গ্রহণ না করে পরবর্তীকালে অন্য একটি এজাহার তৈরি ও তার ভিত্তিতে মামলা রুজু করে প্রকৃত ঘটনাটি নষ্ট করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
চন্দন বর্মণ, সভাপতি, সুনই মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড

এদিকে ঘটনার পর ধরমপাশা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আরিফুল ইসলাম বাদী হয়ে গত রোববার রাতে ৬০-৬৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি মামলা করেছেন। ঘটনার রাতেই পুলিশ ২৩ জনকে আটক করে। এর মধ্যে দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্যদের ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া আবেদনে চন্দন বর্মণ উল্লেখ করেছেন, তাঁর সমিতির নামে সুনই নদ জলমহালটি ১৪২২ থেকে ১৪২৭ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত ছয় বছরের জন্য বন্দোবস্ত পেয়েছেন। বন্দোবস্তের শর্ত অনুযায়ী তিনি জলমহালে মাছ সংরক্ষণ ও আহরণ করে আসছেন। গত বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে থানায় দেওয়া এজাহারভুক্ত আসামিরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জলমহালে হামলা চালায় এবং শ্যামাচরণকে হত্যা করে। এ ঘটনার পর ৯ জানুয়ারি তারা থানায় সুনির্দিষ্টভাবে আসামির নাম উল্লেখ করে থানায় এজাহার দেন। কিন্তু তাঁদের এজাহার গ্রহণ করা হয়নি। পরে পুলিশ বাদী হয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে থানায় একটি মামলা করেছে।

চন্দন বর্মণ লিখেছেন, এভাবে এজহার দায়ের সম্পূর্ণ বেআইনি। উচ্চ আদালতগুলো সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো অপরাধজনক ঘটনার বিষয়ে প্রথম সংবাদের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হওয়া উচিত। কিন্ত ধরমপাশা থানা তাঁর দায়ের করা অভিযোগ গ্রহণ না করে পরবর্তীকালে অন্য একটি এজাহার তৈরি ও তার ভিত্তিতে মামলা রুজু করে প্রকৃত ঘটনাটি নষ্ট করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

জলমহালটি নিয়ে উচ্চ আদালতে ওই সমিতির পৃথক দুটি মামলা থাকায় আদালতের নির্দেশে জলমহালটিতে এখন স্থিতাবস্থা রয়েছে। এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাতে সেখানে হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

ঘটনাটি নিয়ে সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেন প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘ঘটনার দিন আমি ধরমপাশায় ছিলাম না। এটি সবাই জানে। আমার এতে জড়িত থাকার প্রশ্নই আসে না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত একটি পক্ষ ফায়দা নেওয়ার জন্য এতে আমাকে জড়ানোর অপচেষ্টা করছে। আমি শুধু একজন সাংসদ হিসেবে নয়, সাধারণ জনগণ হিসেবে আমারও দাবি এই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হোক।’

উপজেলা প্রশাসন, মামলার এজাহার, থানা–পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্র অনুযায়ী, সুনই জলমহালটির আয়তন ২০ একরের বেশি। এটি জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনাধীন। বার্ষিক প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ও অন্যান্য শর্ত মেনে ওই জলমহাল ১৪২২ থেকে ১৪২৭ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত ছয় বছরের জন্য ইজারা পায় সুনই মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড। সমিতির সভাপতি চন্দন বর্মণ যথারীতি ইজারামূল্য পরিশোধ করেন এবং জলমহালটির পাড়ে বসবাসসহ অন্যান্য কাজের জন্য পাঁচটি ঘর স্থাপন করে জলমহালটি রক্ষণাবেক্ষণ শুরু করেন। একই সমিতির সভাপতি দাবি করে স্থানীয় সাংসদের ছোট ভাই ধরমপাশা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের অনুসারী সুবল বর্মণ (৩০) তিন মাস আগে ১৫–২০ জন লোক নিয়ে জলমহালটির পারে দুটি ঘর তৈরি করেন এবং ১৪২৭ বঙ্গাব্দের জন্য ওই জলমহালের ইজারামূল্য পরিশোধ করেন। তিনিও তাঁর লোকজন নিয়ে সেখানে বসবাস করতে শুরু করেন।

জলমহালটি নিয়ে উচ্চ আদালতে ওই সমিতির পৃথক দুটি মামলা থাকায় আদালতের নির্দেশে জলমহালটিতে এখন স্থিতাবস্থা রয়েছে। এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাতে সেখানে হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

মন্তব্য করুন